২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ০৯ ম সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ২৬ ফেব্রু – ০৪ মার্চ ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 09th issue: Berlin, Sunday 26 Feb – 04 Mar 2017

কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?

অভিজিৎ রায় এর শেষ ব্লগ - ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

প্রতিবেদকঃ অভিজিৎ রায় তারিখঃ 2015-02-27   সময়ঃ 14:52:26 পাঠক সংখ্যাঃ 442

কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে? (Why there is something rather than nothing?) – প্রথম কবে এ প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছিলাম তা আজ মনে নেই। সম্ভবত: জঁ-পল সাত্রের (১৯০৫- ১৯৮০) অস্তিত্ববাদী দর্শন ‘বিয়িং এণ্ড নাথিংনেস’ কিংবা মার্টিন হাইডেগারের (১৮৮৯ -১৯৭৬) অধিপদার্থবিদ্যা বিষয়ক বই ‘ইন্ট্রোডাকশন টু মেটাফিজিক্স’ পড়তে গিয়ে। শেষোক্ত বইটির প্রথম লাইনটিই ছিল – ‘হোয়াই দেয়ার ইজ সামথিং র্যা দার দেন নাথিং?’। তারপর থেকে বহু বইয়ে, অসংখ্য জায়গাতেই এর উপস্থিতি টের পেয়েছি। দার্শনিক উইলিয়াম জেমস (১৮৪২ – ১৯১০) তার ‘সাম প্রবলেমস অব ফিলসফি’ গ্রন্থে এ প্রশ্নটিকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘অন্ধকারতম দর্শন’ হিসেবে। জ্যোতির্পদার্থবিদ স্যার আর্থার বার্নার্ড লোভেল (১৯১৩ – ২০১২) একে দেখেছেন ‘ব্যক্তির মনকে ছিন্ন ভিন্ন করা’ প্রশ্ন হিসেবে। সত্যিই তো – এই যে বিশাল মহাবিশ্ব আর এই বস্তুজগৎ, এতো সবকিছুর বদলে যদি কিছুই না থাকতো – কীই বা ক্ষতি হতো? আর কেনই বা কোনো কিছু না থাকার বদলে এতো কিছু আছে? বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আমার পড়া এখন পর্যন্ত সর্বশেষ বই জিম জোল্টের ‘হোয়াই ডাস দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সিস্ট’ (২০১২) । সেখানে লেখক রসিকতা করে বলেছেন –‘সাইকিয়াট্রিক রোগীরা এই প্রশ্ন দিয়ে বরাবরই আচ্ছন্ন থাকে’!

দার্শনিকদের পাশাপাশি আছেন ধর্মবেত্তারাও। কিছুদিন আগ পর্যন্ত এ প্রশ্নটি ধর্মবেত্তাদের প্রিয় একটি প্রশ্ন হিসেবে বিরাজ করেছিল। বিজ্ঞানীদের মুখে কুলুপ আঁটাতে এ প্রশ্নটি উচ্ছ্বাসভরে ব্যবহার করা হত। হ্যাঁ, ‘হোয়াই দেয়ার ইস সামথিং র্যা দার দ্যান নাথিং’ – এ প্রশ্নটি সত্যই ছিল বিজ্ঞানীদের প্রতি বড় সড় চ্যালেঞ্জ; প্যালের ঘড়ি, হয়েলের বোয়িং, কিংবা হাল আমলের হুমায়ুনের নাইকন ক্যামেরা যেমন ধার্মিকদের তৃপ্তির ঢেকুর উৎপাদন করতো, এই প্রশ্নটিও অনেকটা বিজ্ঞান-ধর্মের বিতর্কে বিজ্ঞানের কফিনে শেষ পেরেক পোতার মতোই হয়ে উঠেছিল যেন অনেকের কাছে । মূল ধারার বিজ্ঞানীরা এতদিন ধরে এর উত্তর প্রদানে অনীহ এবং নিশ্চুপই ছিলেন বলা যায়। অনেকে আবার এ ধরণের প্রশ্ন বিজ্ঞানের বিষয় নয় বলে পাশ কাটিয়ে যেতেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে পরিস্থিতি অনেক বদলেছে। এখন অনেক বিজ্ঞানীই আস্থার সাথে অভিমত দিচ্ছেন যে তারা এর উত্তর জানেন। প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর নিয়ে হাল্কা বিতর্ক থাকলেও ধর্ম এবং দর্শনের বলয়ে পড়ে থাকা এ প্রশ্নটিতে পদার্থবিজ্ঞানীরা যে নাক গলাতে শুরু করেছেন, এবং এ নিয়ে একটা অবস্থানে পৌঁছুতে চাইছেন সেটি এখন মোটামুটি নিশ্চিত। সেজন্য বেশ ক’বছর ধরেই দেখছি পদার্থবিজ্ঞানীদের লেখা বইগুলোতে বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসতে।

যেমন, বিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিদ লরেন্স ক্রাউস একটি চমৎকার বই লিখেছেন ‘A Universe from Nothing: Why There Is Something Rather than Nothing’ শিরোনামে । বাংলা করলে বলতে পারি – ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব – কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?’ বইটিতে পদার্থবিদ ক্রাউস পদার্থবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে শূন্য থেকে আমাদের চির চেনা বিপুল মহাবিশ্ব উদ্ভূত হতে পারে একেবারেই প্রাকৃতিক উপায়ে। যারা লরেন্স ক্রাউসের ব্যাপারে জানেন না, তাদের জন্য দু লাইন বলি। অধ্যাপক লরেন্স ক্রাউস বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সুপরিচিত জ্যোতির্পদার্থবিদ, পিএইচডি করেছিলেন এমআইটি থেকে ১৯৮২ সালে এবং বর্তমানে অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অরিজিন’ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টের কর্ণধার। এই প্রজেক্টে মহাবিশ্বের উৎপত্তি, পদার্থের উৎপত্তি থেকে প্রাণের উৎপত্তি সহ নানা ধরণের প্রান্তিক বিষয় আশয় নিয়ে তার তত্ত্বাবধানে গবেষণা করা হয়।

ক্রাউসের বইটিতে শূন্য থেকে মহাবিশ্বের উদ্ভবের পাশাপাশি আলোচিত হয়েছে দর্শনের সবচেয়ে প্রগাঢ় সমস্যাটি – আমাদের অস্তিত্বের একদম গোঁড়ার সমস্যা –কেনইবা একেবারে কিছু না থাকার বদলে গ্যালাক্সি, তারকাপুঞ্জ, সৌরজগত, পৃথিবী, জীবজগৎ সহ এতকিছুর অস্তিত্ব রয়েছে আমাদের চারপাশ জুড়ে। এত কিছু থাকার বদলে নিঃসীম আঁধার থাকলেই বা কি ক্ষতি ছিল?

ক্রাউসের বইটির মুখবন্ধে বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স বলেছেন, ‘জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডারউইনের অরিজিন অব স্পিশিজ যেমনি, জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ক্রাউসের শূন্য থেকে মহাবিশ্বও তেমনি’। ডারউইনের বইয়ে বর্ণিত বিবর্তন তত্ত্ব যেমন জীবজগতের ক্ষেত্রে কোন অপ্রাকৃত সত্ত্বা থাকার অনুকল্পকে বাতিল করে দিয়েছে, ক্রাউসের বইও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অর্থাৎ, মহাবিশ্বের অস্তিত্বের পেছনে কোন অপ্রাকৃত বা অপার্থিব সত্ত্বার অস্তিত্ব থাকার সকল দাবীকে বাতিল করে দিয়েছে। পাঠকেরা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন ক্রাউসের বইটির শিরোনামটিই কেন্দ্রীভূত হয়েছে ধার্মিকদের ছুঁড়ে দেয়া প্রিয় এ প্রশ্নকে উপজীব্য করে। বলা বাহুল্য যে সমস্ত মূলধারার পদার্থবিদের কথা আমি উল্লেখ করেছি আমার লেখায়, তারা সবাই বিজ্ঞানের চোখ দিয়েই সমস্যাটি মোকাবেলা করেছেন এবং সমাধানে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছেন, ধর্মবেত্তা কিংবা দার্শনিকদের মত জল ঘোলা না করে। যেমন, ক্রাউস তার বইয়ে বলেছেন (‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’, পৃষ্ঠা ১৪৩) –

‘আমাদের মহাবিশ্বের আধুনিক বিজ্ঞানের ছবি, এর ইতিহাস, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ, এবং সর্বোপরি শূন্য বলতে আসলে কী বোঝায় তা অনুধাবন এবং পর্যালোচনা করে আমরা এটুকু বলতে পারি যে, এখন এ প্রশ্নটিকে মোকাবেলা করার জন্য সবচেয়ে ভাল অবস্থায় আছি’।

লরেন্স ক্রাউস কোন অতিশয়োক্তি করেননি। একটা সময় ভাবা হত ‘নাথিং’ ব্যাপারটা হচ্ছে বস্তুর কিংবা জগতের জন্য স্বাভাবিক অবস্থা, আর ‘সামথিং’ ব্যাপারটা আরোপিত। যেমন জার্মান গণিতবিদ লিবনিৎস তার ১৬৯৭ সালে লেখা ‘অন আল্টিমেট অরিজিন অব থিংস’ নামক একটি প্রবন্ধে এ বিষয়ে অভিমত দেন এই বলে যে, ‘নাথিং’ ব্যাপারটা স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু অন্যদিকে ‘সামথিং’ ব্যাপারটা অর্জন করতে কাজ করতে হয় । আর এমনি এমনি নাথিং থেকে সামথিং এ উত্তরণ ঘটেনা বাইরের কোন কিছুর হস্তক্ষেপ ছাড়া। লিবনিৎসের কাছে এর সমাধান ছিল যথারীতি ‘ঈশ্বর’।

তারপর থেকে এভাবেই আমাদের দিন গেছে। ‘কেন কোন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?’ উত্তর খুব সোজা - কারণ হলেন ঈশ্বর। আসলে স্টিফেন হকিং-এর মতো বিজ্ঞানীদের হাতে সত্তরের দশকে ‘কোয়ান্টাম কসমোলজির’ জন্ম হবার আগ পর্যন্ত বিজ্ঞান এর বিপরীতে সফল উত্তর দিতে পারেনি, ঠিক যেমনি ডারউইন আসার আগ পর্যন্ত প্যালের ডিজাইন আর্গুমেন্টকে ঠিকমতো মোকাবেলা করার উপকরণ খুঁজে পাওয়া যেত না। তারপরেও কিছু ঘার ত্যারা দার্শনিক যে ছিলেন না তা নয়। তারা এ ধরণের ‘হোয়াই দেয়ার ইজ সামথিং র্যাকদার দেন নাথিং’ মার্কা প্রশ্ন মুচকি হেসে বলতেন, তা ‘নাথিং’ ব্যাপারটা যদি এত স্বাভাবিক আর স্বতঃস্ফূর্ত হয়, তাহলে ঈশ্বরেরই বা থাকার দরকার কি ছিল? Why there is God rather than nothing? ‘নাথিং’ বাবাজিকে প্রতিহত করতে অদৃশ্য অপ্রমাণিত ঈশ্বরকে সাক্ষীগোপাল হিসেবে দেখানো যাবে, কিন্তু বাস্তব যে মহাবিশ্বটা আমরা চোখের সামনে হরহামেশা দেখছি সেটাকে নয়, এ ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের হাস্যকর হয়ে যাচ্ছে না? এমনকি অন্তিম প্রশ্নগুলোর উত্তর হিসেবে ঈশ্বরকে সাক্ষীগোপাল করে হাজির করার ব্যাপারটা যে আসলে কোন উত্তর নয়, তা আমাদের কৃষক দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বরের মাথায়ও এসেছিল। এ জন্যই ‘সত্যের সন্ধান’ বইয়ে তিনি প্রশ্ন করেছেন – ‘ঈশ্বর সময়কে সৃষ্টি করেছেন কোন সময়ে?’ কিংবা ‘স্থানকে সৃষ্টি করা হলো কোন স্থানে থেকে?’ কিংবা ‘শক্তি সৃষ্টি করা হলো কোন শক্তি দ্বারা?’ । ধার্মিকেরা এই ধরণের প্রত্যুত্তরে খুব একটা ভাল উত্তর কখনোই দিতে পারেননি। বরং গোস্বা করেছেন। এক দুর্মুখ নাস্তিক একবার খ্রিষ্টীয় ধর্মবেত্তা সেন্ট অগাস্টিনকে জিজ্ঞাসা করেছিল – ‘ফাদার, এই মহাবিশ্ব বানানোর আগে ঈশ্বর বাবাজি কী করছিলেন বলুনতো?’ অগাস্টিন রাগে ক্ষেপচুরিয়াস হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তোদের মত লোক, যারা এ ধরণের প্রশ্ন করে, তাদের জন্য জাহান্নাম তৈরি করছিলেন ঈশ্বর’!

তবে ধার্মিকেরা গোস্বা করলেও দার্শনিকেরা এভাবে সবসময়ই লিবনিৎসের উপসংহারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে গেছেন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে। আগেও করেছেন, এখনো করছেন। যেমন, জার্মান দার্শনিক এডলফ গ্রুনবোম তার ‘দ্য পভার্টি অব থিইস্টিক কসমোলজি’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্রে পদ্ধতিগতভাবে লিবনিৎসের উপসংহারের সমালোচনা হাজির করেছেন, এই সময়ের প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী শন ক্যারল সেটা তার একটি ব্লগে উল্লেখ করেছেন ।

তবে সনাতন দার্শনিকেরা উত্তর দিতে পারলেও আমার মতে সেগুলো ছিল মোটা দাগে স্রেফ দার্শনিক আলোচনা, বৈজ্ঞানিক কোন সমাধান নয়। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হল - লিবনিৎসের সময়কালে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এবং এ সংক্রান্ত অগ্রগতি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের কোন ধারনাই ছিল না। চোখের সামনে দেখা বিশ্বজগতের জন্য যে নিয়ম প্রযোজ্য, সেটার ভিত্তিতেই তারা এবং তাদের মত দার্শনিকেরা সিদ্ধান্ত নিতেন। তারা জানতেন না যে, তাদের দৃশ্যমান জগতের বাইরে বিশাল একটা জগৎ আছে; এই সেই আন্তঃআণবিক জগৎ, যে জগতের নিয়মগুলো অনেকটা হ্যারি পটারের গল্পের ‘হগওয়ার্টস স্কুল’-এর নিয়ম কানুনের মতোই অদ্ভুত। আমাদের দৃশ্যমান জগতে আমরা শূন্য থেকে কিছু তৈরি হতে দেখি না, কিংবা আমরা আমাদের বাড়ীর ইটের দেয়াল দেয়াল ভেদ করে হেঁটে ওপারে চলে যেতে পারি না। কিন্তু কোয়ান্টাম জগত যেন ভিন্ন, এখানে কণা আর প্রতি-কণারা রীতি মত শূন্য থেকে উদ্ভূত হয়, নিশ্চিত অবস্থান নেয়ার বদলে সম্ভাবনার বলয়ে থাকতে পছন্দ করে, আর মাঝে মধ্যেই তারা ‘কোয়ান্টাম টানেলিং’ এর মাধ্যমে দুর্লঙ্ঘ্য বাধার প্রাচীর গলে চলে যায় অশরীরী সত্তার মতোই। কোয়ান্টাম জগতের নিয়ম কানুনগুলোকে অবাস্তব ভাবলে কিন্তু ভুল হবে। এটা আমার এই প্রবন্ধের মতোই নিখাদ বাস্তব। যারা ইলেকট্রনিক্সের যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করেন তারা সবাই টানেল ডায়োড এবং জোসেফসন জংশনের কথা জানেন , এগুলো কিন্তু কোয়ান্টাম রাজ্যের হ্যারি পটারের সেই ‘হগওয়ার্টস স্কুল’-এর মতো নিয়ম কানুনের উপর ভর করেই চলে। এমনকি আমাদের পরিচিত সূয্যি মামার ভেতরে অনবরত যে হাইড্রোজেনের ফিউশন ঘটে চলছে বলে আমরা জানি, সেটাও কিন্তু কোয়ান্টাম জগতের নীতি মেনেই হচ্ছে ।

বিগত সত্তর এবং আশির দশকে বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখলেন, কোয়ান্টাম জগতে ‘নাথিং’ ব্যাপারটি ডিফল্ট কিছু নয়, বরং ‘সামথিং’ ব্যাপারটাই বরং সেখানে ‘ডিফল্ট’। নাথিং ব্যাপারটা সেখানে মোটা দাগে ‘আনস্টেবল’ বা অস্থিতিশীল। শূন্যতা অস্থিতিশীল বলেই ওটা কখনো শান্ত সমাহিতভাবে পড়ে থাকতে পারে না, সেখানে অনবরত-ভাবে তৈরি হতে থাকে অসদ কণিকা, অহর্নিশি চলতে থাকে ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশনের রহস্যময় খেলা। আমরা আমাদের বইয়ে আগে আলোচনা করেছি - এরিস্টটল একসময় প্রকৃতিজগৎ দেখে মন্তব্য করেছিলেন, ‘প্রকৃতি শূন্যতাকে একদম পছন্দ করে না’ (Nature abhors a vacuum)। এমনকি শূন্যতাকে দেখা হত ‘ব্লাসফেমি’ হিসেবে। কিন্তু পরে বিজ্ঞানী টরিসেল্লি তার পারদ নিয়ে ঐতিহাসিক পরীক্ষার সাহায্যে দেখিয়ে দেন যে, শূন্যতা ইচ্ছে করলেই তৈরি করা যায়, এতে ব্লাসফেমিও হয় না, কারো মাথায় আকাশও ভেঙ্গে পরে না। অবাক ব্যাপার হচ্ছে ‘প্রকৃতি শূন্যতাকে একদম পছন্দ করে না’ - এ উক্তিটি যেন কোয়ান্টাম জগতের জন্য সত্য হয়ে ফিরে এসেছে। বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ক্লোস তার ‘নাথিং’ বইয়ে এ জন্যই বলেছেন, ‘এরিস্টটল কোয়ান্টাম জগতকে দেখে যাওয়ার সুযোগ পাননি, কিন্তু তার এই উচ্চারণ কোয়ান্টাম জগতের জন্য যেন হাড়ে হাড়ে সত্য হয়ে গেছে’ ।

‘নাথিং’ ব্যাপারটা যে অস্থিত এবং নড়বড়ে টাইপের কিছু, তা উল্লেখ করেছিলেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক উইলজেক আশির দশকে সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে । ১৯৮০ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘The Cosmic Asymmetry Between Matter and Antimatter ’ । মহাবিশ্বের উৎপত্তির উষালগ্নে পদার্থ এবং প্রতিপদার্থ যখন উদ্ভূত হয়েছিল এক রহস্যময় কারণে প্রকৃতি প্রতিপদার্থের তুলনায় পদার্থের প্রতি খুব সামান্য হলেও পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছিল। এই পক্ষপাতিত্বের ব্যাপারটা যদি না ঘটতো, তাহলে আজ আমরা এখানে বসে বসে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে এই আঁতেলেকচুয়াল প্রশ্ন করার সুযোগ পেতাম না। ম্যাটার এবং এন্টিম্যাটার একে অপরকে আলিঙ্গন করে ধ্বংস করে দিত, আর আমাদের সামনে তখন চেনা জানা পদার্থ, জীবজগত নক্ষত্ররাজির বদলে থাকত কেবল তেজস্ক্রিয়তায় পরিপূর্ণ অবারিত এক শূন্যতা। আমাদের এই পার্থিব প্রাণ-চাঞ্চল্যের বদলে বিরাজ করতো একেবারে কবরের নিস্তব্ধতা। তবে একটি বিষয় এখানে উল্লেখ্য। কোন ‘অলৌকিক’ কোন কারণে এই পক্ষপাতিত্ব ঘটেনি। আর এমনও নয় যে প্রকৃতিকে বিশাল কোন অলৌকিক খেলা দেখাতে হয়েছিল এর জন্য। বরং বিজ্ঞানীরা গণনা করে দেখেছেন সূচনা লগ্নে পদার্থ-প্রতিপদার্থের মধ্যে এক বিলিয়নের এক ভাগ মাত্র অসমতাই খুলে দিতে পারতো আমাদের এই চেনা জানা মহাবিশ্ব তৈরি হবার দুয়ার। আর সত্য বলতে কি – ঠিক তাই সম্ভবত হয়েছে। আজকের মহাজাগতিক পশ্চাৎপট বিকিরণ বা কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ঠিক তেমনটিই দেখছেন, যা তারা তাত্ত্বিকভাবে গণনা করে পেয়েছিলেন । ফ্র্যাঙ্ক উইলজেক তার সেই প্রবন্ধে ব্যাখ্যা করেছিলেন কীভাবে অলৌকিক নয়, বরং নিতান্ত প্রাকৃতিক উপায়ে প্রতিসাম্যতার ভাঙনের মাধ্যমে শুরুতে পদার্থ এবং প্রতিপদার্থের মধ্যকার অসমতা তৈরি হয়েছিল, এবং তার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল – হ্যাঁ, যে কথাটা আগে আমি বলেছি – ‘শূন্য ব্যাপারটা অস্থিতিশীল’। ব্যাপারটা তিনি তার পেপারে লিখেছিলেন এভাবে –

‘ধারণা করা যায় যে, মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল যতদূর সম্ভব সর্বোচ্চ প্রতিসম দশার (symmetrical state) মধ্য দিয়ে, এবং এ দশায় কোন পদার্থের অস্তিত্ব ছিল না, মহাবিশ্ব ছিল একটি ভ্যাকুয়াম। দ্বিতীয় দশায় পদার্থ এলো। এই দশায় প্রতিসাম্যতা ছিল কিছুটা কম, কিন্তু শক্তিও ছিল কম। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত কম প্রতিসম দশা এসে সেটি বেড়ে গেল খুব দ্রুত। এই অবস্থান্তরের ফলে যে শক্তি নির্গত হল সেটা কণা তৈরি করল। এই ঘটনা মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং হিসেবে চিহ্নিত করা যায় … কাজেই “কেন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?” – প্রাচীন এ প্রশ্নটির যথার্থ উত্তর হল – ‘নাথিং’ ব্যাপারটা অস্থিতিশীল’ ।

জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীদের দেয়া সর্বাধুনিক তত্ত্ব থেকে আমরা এখন জানি যে, আমাদের এই মহাবিশ্ব একটি ‘কোয়ান্টাম ইভেন্ট’ হিসেবেই একসময় আত্মপ্রকাশ করেছিল । কাজেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মূল সূত্রগুলো মহাবিশ্বের উৎপত্তির সময়ও একইভাবে প্রযোজ্য হবে সে আর নতুন কি! সেটা করতে গিয়েই বিজ্ঞানীরা দেখলেন শূন্য থেকে মহাবিশ্বের আবির্ভাব কেবল সম্ভব তাই নয়, রীতিমত অবশ্যম্ভাবী। সেজন্যই ‘গ্র্যাণ্ড ডিজাইন’ বইয়ে স্টিফেন হকিং বলেছেন –

‘মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সূত্রের মতো পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন সূত্র কার্যকর রয়েছে, তাই একদম শূন্যতা থেকেও মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্ভব এবং সেটি অবশ্যম্ভাবী। ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎপত্তি’ হওয়ার কারণেই ‘দেয়ার ইজ সামথিং, র্যা দার দ্যান নাথিং’, সে কারণেই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব রয়েছে, অস্তিত্ব রয়েছে আমাদের। মহাবিশ্ব উৎপত্তির সময় বাতি জ্বালানোর জন্য ঈশ্বরের কোন প্রয়োজন নেই।’

আসলে কোয়ান্টাম শূন্যতা অস্থিতিশীল বলেই সেখানে ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎপত্তি’র মাধ্যমে বস্তু কণার উদ্ভব অবশ্যম্ভাবী। ব্যাপারটি ব্যাপারটি খোলাসা করেছেন লরেন্স ক্রাউসও তার সাম্প্রতিক ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইয়ে (‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’, পৃষ্ঠা ১৬৯) :

‘কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির ক্ষেত্রে মহাবিশ্ব শূন্য থেকে উদ্ভূত হতে পারে, এবং হবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। সে সমস্ত মহাবিশ্ব ফাঁকা হবার দরকার নেই, তাতে পদার্থ এবং শক্তি থাকতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না এর মাধ্যাকর্ষণের সাথে যুক্ত ঋণাত্মক শক্তি সহ এর সর্বমোট শক্তি শূন্য হবে’।

এবং ক্রাউসের সুচিন্তিত উপসংহার (‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’, পৃষ্ঠা ১৭০) –

‘ব্যাপারটা খুব পরিষ্কার। কোয়ান্টাম মাধ্যাকর্ষণ কেবল মহাবিশ্বকে শূন্য থেকে উদ্ভূত হতে কেবল অনুমতি দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, একেবারে অবশ্যম্ভাবী করে তুলে। কারণ, স্থান কালের অবর্তমানে যে শূন্যাবস্থার কথা আমরা বলছি সেটা একেবারেই আনস্টেবল বা অস্থিতিশীল ।

একই ধারণার প্রতিফলন আমরা দেখি পদার্থবিদ ভিক্টর স্টেঙ্গরের বিভিন্ন বইয়ে এবং প্রবন্ধে । তিনি তার ‘The Comprehensible Cosmos’ বইয়ে দেখিয়েছেন যে, কোন কিছু থাকা এবং না থাকার সম্ভাবনার ব্যাপারটি আসলে গণনা করা সম্ভব, এবং কোন কিছু অস্তিমান হয়ে উঠার সম্ভাবনা ষাট শতাংশেরও বেশি পাওয়া যায় । অধ্যাপক স্টেঙ্গার তার প্রবন্ধটি শেষ করেছেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক উইলজেকের পেপার থেকে উদ্ধৃতিটি হাজির করে, যেখানে তিনি অভিমত দিয়েছেন ‘নাথিং’ ব্যাপারটা অস্থিতিশীল’।

সংশয়বাদী দার্শনিক মাইকেল শারমার সম্প্রতি ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ এবং তার সম্পাদিত ‘স্কেপ্টিক’ পত্রিকায় এ নিয়ে দুটি প্রবন্ধ লিখেছেন। স্কেপ্টিক পত্রিকায় প্রকাশিত দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে কেন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে – এই রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে অন্ততঃ বারোটি সমাধান হাজির করেছেন। তার মধ্যে ধার্মিকদের ‘ঈশ্বর অনুকল্প’টি বাদ দিলে শারমার আরো যে এগারোটি সমাধান হাজির করেছেন তার সবগুলোই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানীদের দেওয়া বৈজ্ঞানিক সমাধান, যেগুলোতে অপার্থিব এবং অলৌকিক কোন সত্তা আমদানি না করেই ব্যাপারটিকে মোকাবেলা করা যায়। এর মধ্যে যে সমাধানটিকে সবচেয়ে শেষে রেখেছেন, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সমাধান বলে মত দিয়েছেন শারমার - ‘শূন্যতা অস্থিতিশীল’ ।

ক্যানাডা-নিবাসী গণিতবিদ, কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মীজান রহমানের সাথে মিলে আমি একটি বই লিখেছি সম্প্রতি। শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব -মহাবিশ্বের উৎপত্তির সাম্প্রতিকতম ধারণা’ নামের এ বইটিতে মহাবিশ্বের উৎপত্তির সাম্প্রতিক ধারণাগুলো নিয়ে আলোচনার অবকাশ পেয়েছি; বিশেষত আলোচনা করেছি দীর্ঘ পরিসরে সাম্প্রতিক স্ফীতি তত্ত্ব (inflation theory) নিয়ে। বিগত আশির দশকে আলেক্সেই স্তারোবিনস্কি, ডেমোস কাজানাস, অ্যালেন গুথ এবং আঁদ্রে লিন্ডে প্রমুখ খ্যাতনামা বিজ্ঞানীর হাত দিয়ে স্ফীতিতত্ত্বের যে বিকাশ ঘটেছে, এবং স্টিফেন হকিং, লরেন্স ক্রাউস প্রমুখ বিজ্ঞানীদের লেখা সাম্প্রতিক জনপ্রিয় বই-পত্রে যে ধারণাটিকে বিগ ব্যাং পরবর্তী সবচেয়ে অগ্রসারমান অভিযাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বস্তুত স্ফীতি তত্ত্বকে অধিকাংশ মূলধারার জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীরাই মহাবিশ্বের উৎপত্তির রহস্য সমাধানে সবচেয়ে নিয়ে জোরালো তত্ত্ব বলে আজ মেনে নিয়েছেন। আমি অতীতে মুক্তমনা, সায়েন্স ওয়ার্ল্ড এবং জিরো টু ইনফিনিটি সহ বেশ কিছু ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ লিখেছি এই তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করে । সুগ্রন্থিত এ তত্ত্বের আলোকে দেখানো যায়, শুরুতে শূন্যতা থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে মহাবিশ্বের যাত্রা শুরু হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দশার পরিবর্তনের (phase transition) মাধ্যমে পদার্থের উদ্ভব ঘটা সম্ভব, এবং বাস্তবে হয়তো সেভাবেই মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটেছে। ব্যাপারটি অস্বাভাবিকও নয়, অবৈজ্ঞানিকও নয়। পদার্থবিজ্ঞানের বহু নামকরা জার্নালে এবং জনপ্রিয় ধারার বইয়ে এর উল্লেখ করেছে।

মহাবিশ্বকে যেহেতু কোয়ান্টাম শূন্যতার মধ্য দিয়ে আবির্ভূত হতে হয়েছে, তাই এর উদ্ভব ঘটেছে কোয়ান্টাম স্তরের ‘অস্থিতিশীলতা’ সামলিয়েই। আমরা আমাদের বইয়ে দেখিয়েছি যে, কেন কোন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে – এটা কোন ধর্মীয় কিংবা দার্শনিক প্রশ্ন নয়, এটা আজ একান্তভাবেই একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। বিগত কয়েক শতকে বিজ্ঞানের যে অগ্রগতি ঘটেছে, তার নিরিখে আমরা বলতে পারি, আমরা এ প্রশ্নকে মোকাবেলা করতে সক্ষম, এবং তা বৈজ্ঞানিকভাবেই। আমাদের বইয়ের মাধ্যমে অস্তিত্বের ব্যাখ্যা হিসেবে যে নতুন বৈজ্ঞানিক ছবিটি আমরা পাঠকদের কাছে নিবেদন করতে চাইছি সেটার সারমর্ম হল এরকমের –

চিত্র: আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোয়ান্টাম শূন্যতা অস্থিতিশীল বলেই সেখানে ‘স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎপত্তি’র মাধ্যমে বস্তু কণার উদ্ভব অবশ্যম্ভাবী। কাজেই “কেন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?” – প্রাচীন এ প্রশ্নটির যথার্থ উত্তর হল – ‘নাথিং’ ব্যাপারটা অস্থিতিশীল’।

কাজেই থেকে কোয়ান্টাম জগতের নিয়ম কানুনের কথা মাথায় রাখলে কিছু ‘না থাকার’ অবস্থা থেকে ‘কিছু থাকার’ পরিস্থিতিতে পৌঁছানো অসম্ভাব্য কিছু নয়। আর এটা তদারকির জন্য আমাদের কোন মধ্যসত্ত্বভোগী ওপরওয়ালার দরকার নেই; প্রাকৃতিকভাবেই এটা সম্ভব। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানের চোখে শূন্যতা ব্যাপারটি মোটাদাগে অস্থিতিশীল।

এবং এটাই ‘বিজ্ঞানের চোখে’ আমাদের অস্তিত্বের মূল কারণ। এই জন্যই কিছু একদম না থাকার বদলে কিছু আছে বলে আমরা জানি। অন্ততঃ আধুনিক বিজ্ঞানের চোখ দিয়ে দেখলে সেটাই এর এখন পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ উত্তর।

কিন্তু কীভাবে এ ধরণের শূন্যতা থেকে এত্তো বিশাল একটা মহাবিশ্বের উদ্ভব ঘটতে পারে? এটা নিয়ে এখানে আর বিষদ আলোচনায় যাচ্ছি না। পাঠকেরা চাইলে সদ্য প্রকাশিত ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইটি (শুদ্ধস্বর, ২০১৫) পড়ে দেখতে পারেন। বইটির প্রতি আমার অবশ্য একটু বাড়তি আবেগ আছে, কারণ- বইটা প্রকাশের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন হবার পর প্রেসে যাওয়ার প্রাক্কালে হঠাৎ করেই আমার সহলেখক প্রখ্যাত গণিতজ্ঞ এবং কানাডার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক মীজান রহমান আমাদের ছেড়ে চলে যান। তিনি তার জীবনকালে কেবল একজন খ্যাতনামা গণিতবিদই ছিলেন না, ছিলেন একজন সুসাহিত্যিকও। তিনি ‘লাল নদী’, ‘তীর্থ আমার গ্রাম, ‘প্রসঙ্গ নারী’, ‘অ্যালবাম’, ‘অনন্যা আমার দেশ’, ‘আনন্দ নিকেতন’, ‘দুর্যোগের পূর্বাভাষ’, ভাবনার আত্মকথন’, ‘শুধু মাটি নয়’ সহ অনেক অসাধারণ গ্রন্থ লিখেছেন, সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে। এর মধ্যে আমার সাথে লেখা ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইটি অধ্যাপক মীজান রহমানের শেষ বই, তাঁর শেষ স্মৃতি। ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’-এর পাণ্ডুলিপি সম্পন্ন করে অধ্যাপক মীজান রহমান যেন হঠাৎ করেই শূন্যে মিলিয়ে গেলেন! কিন্তু তিনি শূন্যালোকে বিলীন হয়ে গেলেও আমাদের জন্য রেখে গেছেন অশূন্য কিছু অনুপ্রেরণা। তিনি তাঁর এই বই এবং অন্য সকল পূর্ববর্তী কাজের মাধ্যমে তিনি আমাদের আলো দিয়ে যাবেন ‘ঐ যে সুদূর নিহারীকা’ র মতোই - অহর্নিশি। এ লেখার মাধ্যমে জানাই তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। (অভিজিৎ রায় |২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ২:৪৪ অপরাহ্ন) সুত্র: বিডি নিউস ২৪

তথ্যসূত্র –

Jim Holt, Why Does the World Exist?: An Existential Detective Story, Liveright, 2012
প্যালের ঘড়ি, হয়েলের বোয়িং সহ বিভিন্ন সৃষ্টিবাদী যুক্তির খন্ডন পাওয়া যাবে অভিজিৎ রায় এবং রায়হান আবীর লিখিত ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ (শুদ্ধস্বর, ২০১১; তৃতীয় সংস্করণ, জাগৃতি, ২০১৫) গ্রন্থে। এ ছাড়া দেখা যেতে পারে মুক্তমনায় প্রকাশিত নীচের লেখাগুলোও -
* ভ্রান্ত ধারণা: ঘড়ির যেমন কারিগর লাগে, তেমনি মহাবিশ্ব তৈরির পেছনেও কারিগর লাগবে; লিঙ্ক - http://mukto-mona.com/evolution/QA/first_WilliamPaley_design_physics.htm
* ভ্রান্ত ধারণা: সরল অবস্থা থেকে এত জটিল জীবজগতের উদ্ভব ঘটা জাঙ্ক ইয়ার্ডে ফেলে রাখা জঞ্জাল থেকে এক ঘূর্নিঝড়ের মাধ্যমে এক বোয়িং বিমান তৈরি হয়ে যাওয়ার মতই অসম্ভব। ; লিঙ্ক -http://mukto-mona.com/evolution/QA/hoyle_boeing.htm
* রায়হান আবীর, মঙ্গলের বুকে পড়ে থাকা সেই নাইকন ক্যামেরাটি,মুক্তমনা, জুলাই ৩১, ২০১২, লিঙ্ক - http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=27782
Lawrence M. Krauss, A Universe from Nothing: Why There Is Something Rather than Nothing, Free Press, 2012.
Leibniz, “On the Ultimate Origination of the Universe”, 1697
Victor Stenger, God: The Failed Hypothesis: How Science Shows That God Does Not Exist, Prometheus Books, 2007
আরজ আলী মাতুব্বর রচনা সমগ্র, পাঠক সমাবেশ।
Grunbaum, Adolf. “The Poverty of Theistic Cosmology” in Brit. J. Phil. Sci. 55, 4, 2004.
দেখুন, Sean Carroll, Why Is There Something Rather Than Nothing?, http://blogs.discovermagazine.com/cosmicvariance/2007/08/30/why-is-there-something-rather-than-nothing/#.UMTdlHep2L8
লিও এসাকি, ইভার গিয়াভার এবং ব্রায়ান জোসেফসন ১৯৭৩ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার পান। এসাকি টানেল ডায়োড আবিষ্কার করেছিলেন, এবং ব্রায়ান জোসেফসন আবিষ্কার করেছিলেন জোসেফসন জাংশন। এ দুটো যন্ত্রই কোয়ান্টাম টানেলিং এর মাধ্যমে কাজ করে।
বিজ্ঞানী হ্যান্স বিথে ১৯৬৭ সালে নোবেল পুরষ্কার পান তারার ভিতরকার ফিউশন প্রক্রিয়া সফলভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।
Frank Close, Nothing: A Very Short Introduction, Oxford University Press, 2009
Frank Wilczek, “The Cosmic Asymmetry Between Matter and Antimatter,” Scientific American 243, no. 6, 82-90, 1980
Lawrence M. Krauss, A Universe from Nothing: Why There Is Something Rather than Nothing, Free Press, 2012
Frank Wilczek, পূর্বোক্ত।
বোল্ড করা অংশটির মূল ইংরেজী পেপারে ছিল এরকম – “The answer to the ancient question ‘Why is there something rather than nothing?’ would then be that ‘nothing’ is unstable.”
এ প্রসঙ্গে স্টিফেন হকিং তার গ্র্যন্ড ডিজাইন বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ে লিখেছেন (অনুবাদ তানভীরুল ইসলাম) – “যদিও আমরা এখনো কোয়ান্টাম মহাকর্ষের কোনো পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব পাইনি তারপরও আমরা জানি মহাবিশ্বের সূচনা একটি কোয়ান্টাম ঘটনা। ফলে, আমরা যেভাবে কোয়ান্টাম তত্ব এবং সাধারণ আপেক্ষিকতাকে বিশেষভাবে মিলিয়ে মহাস্ফিতির তত্ত্ব নিরূপণ করেছি, সেভাবে যদি আরো অতীতে যাই এবং মহাবিশ্বের সূচনা সম্পর্কেই জানতে চাই, তাহলেও অবশ্যই সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব সম্পর্কে আমর যা কিছু জানি তার সাথে কোয়ান্টাম তত্ত্বকে মেলাতে হবে।”।
Victor Stenger, God: The Failed Hypothesis. How Science Shows That God Does Not Exist, Prometheus Books; Reprint edition, 2008
Victor Stenger, Why Is There Something Rather Than Nothing?,CSI, Volume 16.2, June, 2006
Victor Stenger, God: The Comprehensible Cosmos: Where Do the Laws of Physics Come From?, Prometheus Books; 2006
Michael Shermer, Much Ado about Nothing, Scientific American, April 27, 2012.
Michael Shermer, Nothing is Negligible: Why There is Something Rather than Nothing, Skeptic, Vol 17, No. 3, 2012.
মীজান রহমান এবং অভিজিৎ রায়, শূন্য থেকে মহাবিশ্ব: মহাবিশ্বের উৎপত্তির সাম্প্রতিকতম ধারণা, শুদ্ধস্বর, ২০১৫।
অভিজিৎ রায়, স্ফীতি তত্ত্ব ও মহাবিশ্বের উদ্ভব, মুক্তমনা; জিরো টু ইন ফিনিটি (২০১৩)

প্রতিক্রিয়া (১২) »

আমার অনেক কাঙ্খিত প্রশ্নের উত্তর আজ পেলাম।

চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়।
কার জন্য লিখলেন অভিজিৎ দা, কাদের জন্য লিখতেন?
এই দেশ, এই বইমেলা সব শেষ করে দিলো।
আপনার লেখায় অমর আর অজেয় থাকুন দাদা। বাঙলাদেশের মানুষ আরো ১০০ বছর পর বুঝবে আমরা কাকে হারিয়েছি।

‘ধারণা করা যায় যে, মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল যতদূর সম্ভব সর্বোচ্চ প্রতিসম দশার (symmetrical state) মধ্য দিয়ে, এবং এ দশায় কোন পদার্থের অস্তিত্ব ছিল না, মহাবিশ্ব ছিল একটি ভ্যাকুয়াম। দ্বিতীয় দশায় পদার্থ এলো। এই দশায় প্রতিসাম্যতা ছিল কিছুটা কম, কিন্তু শক্তিও ছিল কম। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত কম প্রতিসম দশা এসে সেটি বেড়ে গেল খুব দ্রুত। এই অবস্থান্তরের ফলে যে শক্তি নির্গত হল সেটা কণা তৈরি করল। এই ঘটনা মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং হিসেবে চিহ্নিত করা যায় … কাজেই “কেন কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে?” – প্রাচীন এ প্রশ্নটির যথার্থ উত্তর হল – ‘নাথিং’ ব্যাপারটা অস্থিতিশীল’ ।……………
it is the key argument that starts with an assumption!….this is the nature of atheists. they argue with some assumptions. never with a scientific fact. Darwinism also starts with some irrational assumptions!
actually he provided some scientists name and books name rather than focusing their arguments.

দুইজন ব্লগার একই কায়দায় খুন হল । সরকার কিছু করতে পারল না।
অথচ বই মেলাতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাহিনী মজুত আছে।
এটা সরকারের ব্যর্থতা।

আচ্ছা।। মানলাম এই ভদ্রলোক সৃষ্টককর্তাকে বিশ্বাস করে না।। এই জন্যেই মরছে।।।

তবে নাস্তিকের নাস্তিক হওয়ার অধিকার আছে।।।

  • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Akram Hossain — ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৫ @ ৪:৩৯ অপরাহ্ন

great!!!

যদি কেউ আল্লাকে কিংবা ইসলাম ধর্মকে বিশ্বাস না করে তাতে আল্লাহতালার নির্দেশ আছে তাকে ইসলাম ধর্ম এবং আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কে বোঝাতে হবে। যদি সে বিশ্বাস না করে আল্লাহতালা তাকে খুন করতে বলেন নাই।

  • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন debankur das — ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৫ @ ৭:০৮ অপরাহ্ন

যতদিন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেঁচে থাকবে..ততদিন অভিজিতও বেঁচে থাকবে ….ধর্মের এই অসহিষ্ণুতাকে ঠেকিয়ে রাখার জন্য ….ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও নোংরামির বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ অভিজিৎ জেগে থাকছে..থাকবে..

[…] তারা দুজনেই মৌলবাদবিরোধী লেখালেখিতে সক্রিয় ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী অভিজিৎ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নিয়মিত লিখতেন। […]

  • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সানাউল্লাহ আল-মুবীনফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৫ @ ৯:৩৪ অপরাহ্ন

মহাবিশ্ব অস্তিমান হওয়ার ঝামেলা কেনো নিতে গেলো?

লেখক তার বিশ্বাসকে পাঠকদের কাছে তুলে ধরার জন্য প্রচুর পড়ালেখা করেছেন, পরিশ্রম করেছেন। তিনি জানতেন তার এই মতামত বা মতবাদ তার জন্য বিপদ বয়ে অানতে পারে, তারপরও তিনি যেটা বিশ্বাস করেন সেটাকে সামনে এনেছেন। যদিও আমি তার মতামতের সাথে একমত নই। তবে একটা উপলব্ধি হলো এই ভেবে যে, প্রকৃত ধমীয় জ্ঞান অর্জন করে কলমের জবাব কলমে দিলে ধর্ম এবং সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে।

  • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন shihab — ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৫ @ ১:৪১ অপরাহ্ন



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৭ তে বিতরণকরা নতুন বইয়ে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা ১৭ টি প্রবন্ধ বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামী মৌলবাদী লেখা যোগ হয়েছে, আপনি কি এই পুস্তক আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুমোদন করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ