২৮ জুলাই ২০১৭ ইং

জার্মান কথাসাহিত্যিক হাইনরিখ ব্যোল'এর গল্প: ফ্যাকাশে অ্যানা

অনুবাদ সাহিত্য

প্রতিবেদকঃ গল্পপাঠ তারিখঃ 2016-03-30   সময়ঃ 01:04:24 পাঠক সংখ্যাঃ 333

উনিশ শ পঞ্চাশ সালের বসন্তে আমি যুদ্ধ থেকে ফিরে এলাম। শহরে ফিরে আমার পরিচিত কাউকে পেলাম না। কপাল ভালো যে বাবা আমার জন্য কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন। আমি শহরে একটা রুম ভাড়া নিলাম। সারা দিন বিছানায় শুয়ে থাকি, সিগারেট ফুঁকি আর অপেক্ষা করি। আমি জানি না, কীসের জন্য আমি অপেক্ষা করছি। কাজকর্ম করতে আমার মোটেই ইচ্ছে হতো না। আমার গৃহকর্ত্রীকে আমি টাকা দিয়ে রেখেছিলাম। সে রোজ বাজার করে আনত। আর আমাকে রান্না করে খাওয়াত। যখনই সে আমার রুমে কফি বা খাবার নিয়ে আসত, বেশ অনেকক্ষণ ধরে থাকত। আমার সেটা পছন্দ হতো না। তার ছেলে কালিনোভকা নামে এক শহরে যুদ্ধে মারা গিয়েছিল। কফি নিয়ে রুমে ঢুকে কাপটা টেবিলে রেখে আমার বিছানার কাছে এগিয়ে আসত।
আমার বিছানাটা রুমের এক কোণে একটু অন্ধকারে পাতা ছিল। অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে আমি চোখ বন্ধ করে অলস চিন্তায় মগ্ন থাকতাম। আর সিগারেট টানা শেষ হলে দেয়ালের গায়ে ঘষে নিভিয়ে মেঝের ওপর ফেলে দিতাম। ফলে আমার বিছানার পাশের দেয়ালটা কালো দাগে ভরে গিয়েছিল। আমার গৃহকর্ত্রীর গড়ন হালকা—পাতলা। মুখের দিকে তাকালে বোঝা যেত রক্তশূন্যতায় ভুগছে। মুখটা তাই ফ্যাকাশে। আমার বিছানার কাছে অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণে এসে যখন দাঁড়াত আমি তখন মনে মনে ঘাবড়ে যেতাম। আমি প্রথম প্রথম তার মস্তিষ্কে গোলমাল আছে বলে ভেবেছিলাম। তার চোখ দুটো বেশ বড় বড়। চোখের দৃষ্টি জ্বলজ্বল করত। সে বারবার আমাকে তার ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করত ‘তুমি সত্যি বলছ, ওকে তুমি চিনতে না? শহরটার নাম কালিনোভকা_ তুমি ঠিক বলছ তো, ওখানে তুমি কখনো যাওনি?’

আমি কালিনোভকা নামে কোনো শহরের নাম কোনো দিন শুনিনি। গৃহকর্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে আমি প্রতিবারই দেয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলতাম, ‘না, চিনি না। আমি মনে করতে পারছি না।’

না, আমার গৃহকর্ত্রী পাগল ছিল না। বরং খুবই ভদ্র ছিল। সে যখন বারবার একই প্রশ্ন করত আমি দারুণ যন্ত্রণাবোধ করতাম। সে প্রতিদিন অনেকবার আমাকে একই কথা জিজ্ঞাসা করত। আমি কিচেনে গেলে দেয়ালে ফ্রেমে টাঙানো তার ছেলের রঙিন ফটোর দিকে তাকাতাম। হাসিখুশি মুখ, দেখতে—শুনতে চমৎকার। পরনে পদাতিক সৈনিকের ইউনিফরম।

‘ওটা ব্যারাকে তোলা হয়েছিল’ গৃহকর্ত্রী বলত, ‘ফ্রন্টে যাওয়ার আগে।’

হাফ—সাইজের ফটো। মাথায় স্টিলের হেলমেট। পেছনে মেকি দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, দুর্গের ভগ্নস্তূপের চারপাশে নকল লতাপাতা।

‘সে ট্রামের কন্ডাক্টর ছিল’ আমার গৃহকর্ত্রী বলত, ‘খুব পরিশ্রমী ছেলে।’ এ কথা বলেই পাশের সেলাই মেশিনের ওপরে রাখা একটা ফটো বাক্স তুলে নিত। তার ছেলের ফটোভর্তি বাক্সটা আমার হাতে দিত। স্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে নানা পোজে তোলা ফটো। কিছু ফটোতে একটা ছেলে সামনের সারিতে সবার মাঝখানে সস্নেট হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সস্নেটে ৩, ৭ ও ৮ সংখ্যাগুলো লেখা। কিছু ফটোতে কালো স্যুট পরে প্রীতিভোজের আসরে হাসিমুখে একটা বিরাট মোমবাতি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু ফটোতে লেদ মেশিনে তালাচাবি তৈরি করছে, তার মুখে কালির দাগ আর হাতে একটা রেত।

‘ওটা ঠিক ওর কাজ ছিল না। কাজটা তার জন্য খুবই ভারী ছিল।’ এ কথা বলে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার ঠিক আগে তোলা ফটোগুলো দেখাত। তার ছেলে ট্রাম কন্ডাক্টরের ইউনিফরম পরে বাস টার্মিনালে ৯ নাম্বার বাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার পেছনে সমান্তরাল ট্রামলাইন দুটো একটু এগিয়ে বাঁক নিয়ে অন্য রাস্তার দিকে চলে গেছে। রাস্তার মোড়ে একটা পান—বিড়ির দোকান। দোকানটা আমি চিনতে পারলাম। ওখান থেকে যুদ্ধের আগে হামেশাই আমি সিগারেট কিনতাম। দোকানের পাশে দ—ায়মান গাছটা চোখে ভেসে উঠল। এখনো সেই গাছটা আছে। দোকানের সামনের সোনালি সিংহ আঁকা ফটকঅলা একটা বাড়ি। কিন্তু এখন আর সে বাড়িটা নেই। যুদ্ধের সময় একটা মেয়ের চেহারা মাঝেমধ্যে মনে পড়ত। সুন্দর চেহারা, পটলচেরা চোখ। গায়ের রঙ একটু ফ্যাকাশে। মেয়েটি এ বাস টার্মিনালে ৯ নাম্বার বাসে উঠত।

যতবার গৃহকর্ত্রী আমাকে তার ছেলের ফটোগুলো দেখাত, অনেক কথা আমার মনে পড়ে যেত। ৯ নাম্বার বাস টার্মিনাল, সুন্দর মেয়েটির মুখ, সাবানের ফ্যাক্টরির ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠত। সে সময়ে ওই সাবানের ফ্যাক্টরিতে আমি কাজ করতাম। ট্রামের ঝকঝকানির শব্দ, সিগারেটের বিজ্ঞাপনের সবুজ সাইনবোর্ড, দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গরমকালে লেমনেড খাওয়ার দৃশ্য ছাপিয়ে মেয়েটির মুখ দেখতে পেতাম।

‘হয়তো, তুমি আমার ছেলেকে ঠিকই চিনতে পেরেছ।’ আমার গৃহকর্ত্রী বলত।

আমি মাথা নেড়ে অসম্মতি জানিয়ে ফটোগুলো আবার বাক্সে রেখে দিতাম। গ্লসি কাগজে তোলা ফটোগুলো আট বছরের পুরনো হলেও নতুন বলে মনে হতো।

‘না, না’, আমি জবাব দিতাম, ‘কালিনোভকা কোথায় তাও আমি জানি না।’

আমাকে কিচেনে গৃহকর্ত্রীর কাছে যেতে হতো। সেও আমার কাছে আসত। ফলে আমি যে যুদ্ধের কথাটা সব সময় ভুলে থাকতে চাইতাম সে কথাটাই সারা দিন আমাকে ভাবতে হতো। সিগারেটের ছাইটা খাটের নিচে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে জ্বলন্ত আগুনটা দেয়ালে চেপে নিভিয়ে দিয়ে শুধু ভাবতাম আর ভাবতাম।

সন্ধ্যাবেলা বিছানায় শুয়ে কোনো দিন পাশের ঘরের মেয়েটির হাঁটার শব্দ, কিংবা কিচেনের পাশের ঘরের লোকটির গজগজানি শুনতে পেতাম। লোকটা ঘরে ঢোকার সময় অন্ধকারে বাতির সুইচ হাতড়ে না পেলে গজগজ করত।

তিন সপ্তাহে গৃহকর্ত্রীর ছেলে কার্লের ফটোগুলো কমপক্ষে পঞ্চাশবার দেখার পর হঠাৎ যেন কার্ল যে ট্রামটার সামনে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা যে খালি নয় বুঝতে পারলাম। এবার আমি বেশ মনোযোগ দিয়ে ফটোটা দেখলাম। ট্রামের ভেতর একটি মেয়ে বসে আছে। তার মুখে হাসি। হ্যাঁ, ঠিক, এ মেয়েটির মুখই যুদ্ধের সময় আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠত। গৃহকর্ত্রী আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এবার তুমি নিশ্চয়ই কার্লকে চিনতে পেরেছ, তাই না?’ এ কথা বলে সে আমার পেছনের দিকে সরে গেল। তার অ্যাপ্রোনের ভাঁজ থেকে তাজা সবুজ মটরশুঁটির গন্ধ ভেসে এলো।

‘না।’ আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, ‘তবে আমি মেয়েটিকে চিনি।’

‘মেয়েটিকে চেন?’ গৃহকর্ত্রী বলল, ‘মেয়েটি ওর ফিঁয়াসে। তবে ভাগ্যের কথা যে মেয়েটিকে আর তাকে দেখতে হয়নি...।’

‘কেন?’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

গৃহকর্ত্রী কোনো জবাব দিল না। আমার কাছ থেকে সরে গিয়ে জানালার কাছে একটা চেয়ারে বসে মটরশুঁটি ছিলতে লাগল। আমার দিকে না তাকিয়েই সে বলল, ‘তুমি মেয়েটিকে চেন?’

আমি ফটোটা দুই আঙুলে ভালো করে চেপে ধরে আমার গৃহকর্ত্রীর দিকে ফিরে তাকে সাবানের ফ্যাক্টরিতে আমার কাজ করার কথা, ৯ নাম্বার বাস টার্মিনালের কথা, আর সুন্দরী মেয়েটির সেই টার্মিনালে ট্রামে চড়ার কথা বললাম।

‘আর কিছু জানো না?’

‘না।’ আমি বললাম। গৃহকর্ত্রী মটরশুঁটিগুলোকে একটা চালনিতে রেখে টেপের জলে ধুতে লাগল। আমি কেবল তার পিঠ ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না।

‘মেয়েটিকে আবার দেখলে তুমি বুঝতে পারবে, আমি কেন বললাম, মেয়েটিকে আর কার্লকে দেখতে হয়নি বলে ভালো হলো।’

‘মেয়েটিকে আবার দেখব, কোথায় সে?’ আমি বললাম।

গৃহকর্ত্রী অ্যাপ্রোনে তার হাতটা মুছল। আমার কাছে এসে সাবধানে আমার হাত থেকে ফটোগুলো নিল। তার মুখটা যেন আরো শুকিয়ে গেছে। সে আমার দিকে তাকাল না। তবে আমার বাঁ হাতখানা আলতোভাবে ধরে বলল, ‘তোমার পাশের রুমে থাকে। তার নাম অ্যানা। ওর মুখের রঙটা খুব সাদা বলে ওকে আমরা সব সময় ‘পাঁশুটে অ্যানা’ নামে ডাকতাম। সত্যই কি তুমি ওকে দেখনি?’

‘না’, আমি বললাম, ‘আমি যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তাকে দেখিনি, তবে আমি তার হাঁটার শব্দ শুনি। কেন, তার কী হয়েছে?’

‘ঘটনাটা নিয়ে কথা বলতে আমি ভীষণ কষ্ট পাই। তবে তোমার জেনে রাখা ভালো তার মুখের চেহারা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে, সারা মুখে দাগ... যে দোকানে কাজ করত সে দোকানে একদিন বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল। মেয়েটি বোমার আঘাতে জানালা দিয়ে বাইরে ছিটকে পড়েছিল। তুমি এখন তাকে দেখলে চিনতে পারবে না।’

সেদিন সন্ধ্যাবেলা আমি মেয়েটিকে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। সিঁড়িতে পদশব্দ শুনে আমি তাড়াতাড়ি রুম থেকে বের হয়ে এলাম। না, মেয়েটি নয়। কিচেনের ওপাশের ঘরের ভদ্রলোক। আমাকে হঠাৎ এভাবে রুম থেকে তাড়াহুড়ো করে ছুটে আসতে দেখে তিনি আমার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি বিব্রত কণ্ঠে তাকে ‘শুভসন্ধ্যা’ জানিয়ে আমার রুমে ফিরে গেলাম।

আমি মেয়েটির কাটাছেঁঢ়া মুখের চেহারা কল্পনা নেত্রে দেখতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না, যতবারই মেয়েটির মুখ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছিলে, কাটাছেঁড়ার চিহ্ন থাকলেও সে মুখে সৌন্দর্যের বিন্দুমাত্র অভাব ছিল না। এলিজাবেথ নামে আমার এক গার্লফ্রেন্ডের কথা মনে পড়ল। তার সঙ্গে তখন প্রায়ই ঘুরতে যেতাম। সে আমাকে ‘মুজ’ নামে ডাকতে বলত। আমি যখনই তাকে আলিঙ্গন করতাম, সে হাসত, তখন আমার তাকে কেমন যেন বোকা বোকা মনে হতো। আমি ফ্রন্ট থেকে তার কাছে চিঠি লিখতাম। সে আমাকে ঘরে তৈরি বিস্কুট পাঠাত। আমার কাছে যখন ওগুলো পৌঁছাত তখন ভেঙেচুড়ে গুঁড়ো হয়ে যেত, কখনো কখনো সিগারেট আর খবরের কাগজ পাঠাত। একটা চিঠিতে সে লিখেছিল, ‘আমি জানি, তোমরা যুদ্ধে জিতবে। তুমি যুদ্ধে গেছ ভেবে গর্বে আমার বুক ভরে আছে।’কিন্তু আমি যুদ্ধে যেতে পেরে মোটেই গর্ববোধ করতাম না। তাই ছুটিতে আসার আগে এলিজাবেথকে চিঠি লিখে জানাইনি। ছুটি যাপনের সময় তার কাছে যাইনি। তার বদলে আমি এক তামাক বিক্রেতার মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে যেতাম। মেয়েটি আমাদের বাড়িতেই ভাড়া থাকত। মেয়েটিকে আমি আমার ফ্যাক্টরির সাবান দিয়েছিলাম। তার বদলে মেয়েটি আমাকে সিগারেট দিয়েছিল। আমরা দুজনে মিলে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। একসঙ্গে নেচেছিলাম। একদিন তার বাপ—মা বেড়াতে গেলে সে আমাকে তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। অন্ধকার ঘরের ভেতর তাকে আলিঙ্গন করতে গেলে সে চট করে বাতির সুইচটা টিপে দিল। তার মুখে দুষ্টুমির হাসি। আলোতে দেখলাম, দেয়ালে হিটলারের ছবি টাঙানো। ছবিটা রঙিন। গোলাপি রঙের ওয়াল—পেপারের ওপর হৃৎপি—ের আকারে কয়েকজন রূঢ়মুখো মানুষের ছবি সাঁটা। তাদের চারপাশে পিন দিয়ে কয়েকটা পোস্টকার্ড লাগানো। আশপাশে ছবির কাগজ থেকে কাটা হেলমেট পরিহিত কয়েকজন সৈনিকের ছবি আঠা দিয়ে সেঁটে রাখা হয়েছে। আমি মেয়েটিকে ঠেলে সোফার ওপর ফেলে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। বাইরে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে মনের আকস্মিক উত্তেজনা দমন করেছিলাম। আমার কাছে দুজনই চিঠি লিখেছিল। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করিনি বলে সেই চিঠিতে অনুযোগ করেছিল। কিন্তু আমি তাদের চিঠির কোনো জবাব দিইনি।

অ্যানার জন্য অনেকক্ষণ ধরে আমাকে অপেক্ষা করতে হলো। তার মাঝে অনেক সিগারেট শেষ করলাম। বিচিত্র সব চিন্তা আমার মনের কোণে উঁকি দিয়ে গেল। অবশেষে মেয়েটি এলো। আমার প্রতীক্ষার পালা শেষ হলো। মেয়েটির দরজা খোলার শব্দ পেলাম। সে গুনগুন করে সুর তুলে মৃদু পায়ে ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি তখন সিঁড়িগোড়ায় দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ মেয়েটির ঘরের গুনগুনানি থেমে গেল, হাঁটার শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘরের ভেতর সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা। আমি মেয়েটির ঘরের দরজায় নক করতে গিয়ে ভয় পেয়ে গেলাম। কিচেনের পাশের ঘরের ভদ্রলোক গুনগুনিয়ে গান করে ঘরের ভেতর পায়চারী করছিল। আমার গৃহকর্ত্রী কিচেনে জল গরম করছিল। কিন্তু অ্যানার ঘর নিস্তব্ধ। আমার ঘরের খোলা দরজা দিয়ে দেয়ালের দিকে তাকাতেই সিগারেটের কালো দাগগুলো চোখে পড়ল।

কিচেনের পাশের ঘরের ভদ্রলোক বিছানায় শুয়ে পড়েছে। তার পায়ের শব্দ আর শুনতে পাচ্ছিলাম না। শুধু তার গলার গুনগুন সুর কানে আসছিল। কিচেনে আমার গৃহকর্ত্রীও কেতলিতে আর জল গরম করছিল না। তার কফি পটের টিনের ঢাকনা বন্ধ করার শব্দ শুনতে পেলাম। অ্যানার ঘর তবুও নিস্তব্ধ। সিঁড়ি গোড়ায় দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো হয়তো সে যা ভাবছিল সব ঘটনা আমার কাছে পরে খুলে বলবে এবং সত্যিই সে আমাকে খুলে বলেছিল।

আমি দরজার পাশে দেয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে তাকালাম। রুপালি হ্রদে জল চিকমিক করছে। একটা জলপরী হ্রদের জল থেকে উঠে আসছে। তার মাথার সোনালি চুলগুলো ভেজা, আর মুখে হাসি। ঘন সবুজ ঝোপের পেছনে লুকানো একটি কৃষক বালককে দেখে যেন সে হাসছে। জলপরীর বুকখানা জলের ওপরে ভেসে ছিল। তার গ্রীবাদেশ বেশ লম্বা আর খুব শুভ্র বলে আমার মনে হলো।

আমি জানি না কখন, তবে আমি যখন হাতল ধরে ধীরে ধীরে দরজা খুললাম, ঠিক তখনই বুঝতে পেরেছিলাম অ্যানা আমার। তার সারা মুখে নীলচে কাটাছেঁড়া অসংখ্য দাগ। চুলো থেকে মাশরুম সিদ্ধ করার গন্ধ আসছে। আমি দরজা খুলে অ্যানার কাঁধে হাত রেখে হাসতে চেষ্টা করলাম।

লেখক হাইনরিখ ব্যোল ১৯১৭ সালে জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন। পরে তিনি ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান। তার প্রথম উপন্যাস যুদ্ধবিষয়ক। যুদ্ধে তিনি একজন সৈনিক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি একজন মরালিস্ট। আধুনিক সমাজের সাধারণ মানুষের জীবন ও অনুভূতি তার গল্পে বিবৃত। তিনি ‘জার্মানির বিবেক’ হিসেবে বিবেচিত। ব্যোল একাধিক উপন্যাস ও ছোট গল্প লিখেছেন। তিনি একজন অনুবাদক, প্রাবন্ধিক ও বেতার নাট্যকার। চৌত্রিশটি ভাষায় তার রচনা অনূদিত হয়েছে। ১৯৭২ সালে তিনি সাহিত্যে ‘নোবেল পুরস্কারে’ ভূষিত হন। ‘পাঁশুটে মুখ’ তার ‘পেল অ্যানা’ গল্পের অনুবাদ।

মূল : হাইনরিখ ব্যোল, অনুবাদ : মোবারক হোসেন খান



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৭ তে বিতরণকরা নতুন বইয়ে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা ১৭ টি প্রবন্ধ বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামী মৌলবাদী লেখা যোগ হয়েছে, আপনি কি এই পুস্তক আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুমোদন করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ