১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৫ম বর্ষ ৩৯শ সংখ্যা: বার্লিন, শনিবার ২৪সেপ্ট –৩০সেপ্ট ২০১৬ # Weekly Ajker Bangla – 5th year 39th issue: Berlin, Saturday 24 Sep–30 Sep 2016

বহুবর্ণিল সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক

লেখক সংবাদ

প্রতিবেদকঃ বিডি নিউস ২৪ তারিখঃ 2016-09-28   সময়ঃ 03:35:06 পাঠক সংখ্যাঃ 220

দীর্ঘপাঠে যখন অনীহা, সৈয়দ শামসুল হক-এর ‘খেলারাম খেলে যা’ তখন নীহাররঞ্জন গুপ্তের ‘কালোভ্রমর’, শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’-এর পাশাপাশি আমাকে পাঠে মগ্ন করেছে; পাঠে যখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি তখন তাঁর ‘হৃদকলমের টানে’ টেনেছে। সচেতন পাঠ যখন প্রয়োজনীয় উপযোগী বইটি খুঁজেছে, হাতে তুলে নিয়েছি ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘অন্তর্গত’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘দূরত্ব’; যখন বহুমাত্রিক সৌন্দর্যে যখন প্রেমকে উপলব্ধি করতে চেয়েছি, তখন পড়েছি ‘পরাণের গহীন ভিতর’। সাহিত্যে যখন দেশপ্রেমে আপ্লুত হতে চেয়েছি, যখন সমসাময়িক নানান প্রসঙ্গ উদ্বেল করেছে অন্তর্জগৎ, তখন পড়েছি ‘এক আশ্চর্য সঙ্গমের স্মৃতি’, ‘রাজনৈতিক কবিতা’; আত্মপরিচয়ের সন্ধানে পড়েছি তাঁর ‘আমার পরিচয়’ শিরোনামের কবিতা। নিজেকে কবিতায় সমর্পণ করে যখন কবিজীবন প্রার্থনা করেছি, তখন অনেক কবির আত্মজৈবনিক রচনার পাশাপাশি অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছে সৈয়দ শামসুল হক-এর ‘প্রণীত জীবন’ বা ‘তিন পয়সার জ্যোৎস্না’। জীবনের বাঁকে বাঁকে কবি সব্যসাচী সৈয়দ হক এভাবেই কাঙ্ক্ষিত-প্রার্থিত এবং অনিবার্য হয়ে উঠেছেন একজন সাহিত্যকর্মী এবং মগ্ন পাঠকের কাছে। সৈয়দ শামসুল হক-এর ‘অগ্নি ও জলের কবিতা’ যেমন অন্তর ছুঁয়েছে, তেমনি স্পর্শ করেছে তাঁর অসংখ্য কালজয়ী গানের বাণী। এভাবেই সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক বারবার আমায় আন্দোলিত করেছেন; একজন তৃষিত পাঠকের চিত্ত সিক্ত করেছেন তাঁর বহুবর্ণিল-বৈচিত্র্যঋদ্ধ সৃষ্টিকর্মের দ্যোতনায়। তাঁর বিভিন্ন আঙিনা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনার অবতাড়না হওয়াই যৌক্তিক এবং সঙ্গত; তা না হলে আবিষ্কার-উন্মোচনে যেমন অস্পষ্টতা থেকে যাবার সম্ভাবনা থাকে, তেমনি অতৃপ্তির বিষয়ও থেকে যায়। সমস্ত বিবেচনাকে মাথায় রেখেও বর্তমান আলোচনা সৈয়দ শামসুল হককে নিয়ে, এ আলোচনায় সৈয়দ হক-এর যে কোন আঙিনা যেমন আলোচিত হবে, যে কোন দিক তেমনি স্বল্পালোচিত হবার সম্ভাবনাও আছে।

শ্যামল বদ্বীপভূমি বঙ্গদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে মহান মুক্তিযুদ্ধকেই শ্রেষ্ঠ ঘটনা ও অর্জন বলে চিহ্নিত করা যায় দ্বিধাহীন চিত্তে। একটি জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধ করার সুযোগ একবারই ঘটে। ১৯৭১-এর সেই মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন, সর্বকালের জন্য তারা জাতির শ্রেষ্ঠসন্তান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন। চুয়াল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হলেও বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অদ্যাবধি তেমন উল্লেখযোগ্য কোন সৃষ্টি আমাদের ভাণ্ডারে যুক্ত হয়নি বলে প্রায়শই আক্ষেপ শোনা যায়। বিদগ্ধজনের আক্ষেপ একেবারে অমূলক নয় এ কথা সবাই যেমন মানি; পাশাপাশি এ কথাও তো ঠিক ইতোমধ্যে যতটা প্রাপ্তি ঘটেছে তা কিছুতেই অকিঞ্চিৎকর নয়। আমরা বিশ্বাস করতে চাই আগামীতে নিশ্চয়ই আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা–বাঙালির সৌর্য-বীর্য আর আত্মত্যাগের পটভূমিতে পাবো উত্তীর্ণ কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটক সব। নতুন প্রজন্ম যখন সে কাজে ব্রতী হবে তখন তার হাতে থাকবে না জীবন্ত উপাত্ত, তাকে তখন ইতিহাস ঘেটে গবেষণা করে তথ্য-উপাত্ত খুঁজে নিতে হবে। কাজটি কঠিন হবার পাশাপাশি মূল্যবানও হয়ে উঠবে নিশ্চয়ই।
কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের কলম ও তুলি চিরকাল শান্তির সপক্ষে উচ্চকিত থেকেছে, যুদ্ধ-হানাহানি-রক্তপাতের বিরুদ্ধে তারা থেকেছেন সোচ্চার; মানবতাবিরোধী সমস্ত রক্তপাতের বিরুদ্ধে কবির কলম দ্বিধাহীন চিত্তে সরব হয়েছে সভ্যতার প্রত্যুষ থেকে। ১৯৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি যখন নিরস্ত্র বাঙালির উপর নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, মানবতা যখন হয়েছে ভূলুণ্ঠিত বাংলাদেশের কবিকূল তখন নিঃশঙ্কচিত্তে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন। যুদ্ধ আর রক্তপাতের বিরুদ্ধে পৃথিবীর দেশে দেশে কবিরা কবিতা লিখেছেন এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এ কথাও সমান সত্য, বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের কবিদের লেখা কবিতা যৌক্তিক কারণেই স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত এবং ভিন্ন মাত্রাযুক্ত। ১৯৭১ এ বাঙালি যেমন প্রাণের আবেগ নিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, বাংলাদেশের প্রাগ্রসর কবিদের প্রতিটি উচ্চারণও তেমনি দেশমাতৃকার প্রেমে ছিলো নিবেদিত। ভিয়েতনাম-লাওস-কম্বোডিয়া-লেবানন-ইরান-ইরাক-প্যালেস্টাইন-আফগানিস্তান-এর যুদ্ধ আর রক্তপাতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কবিরা বিভিন্ন সময় কবিতা লিখেছেন; কিন্তু ১৯৭১-এর যুদ্ধ আত্মপরিচয়ের যুদ্ধ, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বিভীষিকা; নিজেদের মা-বোনের সম্ভ্রমহানি, স্বজনের সারি সারি লাশ। আমাদের সে যুদ্ধ হয়ে উঠেছে দুর্বৃত্ত দানবের বিরুদ্ধে মুক্তিকামী মানুষের জীবনপণ গেরিলা লড়াই। সৈয়দ শামসুল হক-এর যুদ্ধ বিষয়ক একটি কবিতার কথা স্মরণ করছি:
সতর্ক নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে যাও সারাদিন সারারাত যখন গ্রামগুলো
জনশূন্য চাতাল চিড় খাওয়া আর উপাসনা চত্বরগুলো ঝরাপাতায়
অনবরত ঢেকে যায় নিঃশ্বাসের শব্দের ভেতরে
তোমাদের চলাচল
যেন তুমি আমাদেরই দ্বিতীয়
শরীর কোনো এক রবীন্দ্রনাথের
গান সমস্ত কিছুর কেন্দ্রেই আছ
এবং ধ্বনিত করছ দুঃখের পাহাড়
আফ্রিকার এশিয়ার
নিসর্গে তুমি নতুন বৃক্ষ
নতুন বর্ষা নতুন ফুল
দিগন্তে নতুন মাস্তুল
পিতৃপুরুষের চিত্রিত দ-
দাউদাউ নাপামের
এধ্যে তুমি হেঁটে যাও
উদ্যত একাকী
জনশূন্য জনপদে উজ্জ্বল এক চিতা

(গেরিলা ॥ সৈয়দ শামসুল হক)
১৯৭১-এর যুদ্ধে একদিকে প্রেম অন্যদিকে প্রবল ঘৃণা। একদিকে বিভীষিকাময় যুদ্ধের নয় মাস অন্যদিকে যুদ্ধোত্তর জীবনে নতুন সংগ্রাম। যুদ্ধের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার ঘৃণ্য চক্রান্ত। সঙ্গত কারণেই যুদ্ধ শেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন যুদ্ধের দীর্ঘ লড়াই। আমাদের যুদ্ধের কবিতা তাই ১৯৭১-এর যুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকেনি; যুদ্ধ বিস্তৃত হয়েছে আশির দশক এবং নব্বইয়ের দশকেও। ১৯৭১-এর যুদ্ধে যেমন শিল্পী-কবিরা সরাসরি যুদ্ধ করেছেন রণাঙ্গনে পরবর্তী কালের শিল্পী-কবিরাও ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে মুক্তির জন্য সমানভাবে অংশ গ্রহণ করেছেন নতুন যুদ্ধে।
মহান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক যুদ্ধভাসান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাঋদ্ধ কবিতা প্রধানত রচিত হয়েছে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে। যুদ্ধোত্তর কালের যুদ্ধের কবিতা এবং চেতনাঋদ্ধ কবিতা রচনায় ব্রতী হয়েছেন বাংলাদেশের অসংখ্য কবি, দু’চারজন ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধের কবিতা লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হক যখন লিখেন:
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়,
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়,
যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালের আলখেল্লায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়,
যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়;
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়,
যখন আমারই দেশে এ আমারই দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায়
ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায়।

(নূরলদীনের সারা জীবন ॥ সৈয়দ শামসুল হক)

সৈয়দ শামসুল হক কেবল বাঙালির নতুন যুদ্ধ নিয়ে কবিতাই লিখেন নি; লিখেছেন নাটকও; তাও আবার কাব্যনাট্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে ক’টি উত্তীর্ণ নাটক আমরা পেয়েছি তার একটি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ অন্যটি ‘নূরলদীনের সারাজীবন’। পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকে লাঞ্ছিতা নারী যখন উচ্চারণ করেন, ‘আমার কী আছে? গ্যাছে সুখ, য্যান কেউ নিয়া গ্যাছে গাভীনের বাঁটে যতটুকু দুধ আছে নিষ্ঠুর দোহন দিয়া…..!’ নতুন যুদ্ধের জন্য মানুষকে জাগাতে যখন দেশপ্রেমের কবিতা-গান প্রয়োজন ঠিক তখন সৈয়দ শামসুল হক লিখলেন:
আমি জন্মেছি বাংলায়, আমি বাংলায় কথা বলি
আমি বাংলার আলপথ দিয়ে, হাজার বছর চলি।
চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে।
তেরোশত নদী শুধায় আমাকে, ‘কোথা থেকে তুমি এলে?’

আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে।
আমি তো এসেছি সওদাগরের ডিঙার বহর থেকে।
আমি তো এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে।
আমি তো এসেছি পালযুগ নামে চিত্রকলার থেকে।

এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার থেকে।
এসেছি বাঙালি জোড়বাংলার মন্দির বেদি থেকে।
এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনা মসজিদ থেকে।
এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে।
………….
পরিচয়ে আমি বাঙালি, আমার আছে ইতিহাস গর্বেরÑ
কখনোই ভয় করি নাকো আমি উদ্যত কোনো খড়গের।
শত্রুর সাথে লড়াই করেছি, স্বপ্নের সাথে বাস,
অস্ত্রেও শান দিয়েছি যেমন শস্য করেছি চাষ,
একই হাসিমুখে বাজিয়েছি বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস,
আপস করি নি কখনোই আমি এই হলো ইতিহাস।

এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?
যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান,
তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংরায় পথ চলি–
চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস, পায়ে উর্বর পলি।

(আমার পরিচয় ॥ সৈয়দ শামসুল হক)

কবিতা ও নাটকে সৈয়দ শামসুল হক-এর অবদানের কথা বলতে গেলে আরও অনেক কথাই বলার আছে, কিন্তু এখানে তাঁর উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’ এবং ‘টেম্পেস্ট’-এর সফল অনুবাদের কথা স্মরণ করে সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক-এর ‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্য থেকে অন্তত একটি কবিতা উদ্ধৃত করে এ অংশের ইতি টানবো:
আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,
ঘরের বিছন নিয়া ক্যান অন্য ধান খ্যাত রোয়?
অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান।
আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি,
বাঁশীর লহরে ডোবা, পরানের ঘাসের ভিতরে,
এখন শুকনা পাতা উঠানের ’পরে খেলা করে,
এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি।
মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়?
পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার?
সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়?
সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথর?
মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর
নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর ॥

(পরানের গহীন ভিতর-৪ ॥ সৈয়দ শামসুল হক)

এভাবেই সব্যসাচী সৈয়দ হক আমাদের কবিতা এবং নাটকে জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেছেন।
কথাশিল্পী সৈয়দ শামসুল হক তাঁর গল্প-উপন্যাস-আত্মজৈবনিক রচনা এবং ব্যক্তিগত রচনা দিয়ে আমাদের কথাসাহিত্যেও প্রধান পুরুষ হয়ে উঠেছেন, তাঁর বেশ ক’টি উপন্যাসের নাম ইতোমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে; আমার বিশ্বাস যে-কোন সচেতন পাঠক তাঁর গল্প-উপন্যাস এবং ব্যক্তিগত রচনাগুলো পাঠ করলেই কথাসাহিত্যে তাঁর দীপ্ত অবস্থানের কথা মেনে নেবেন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্য, বিশেষ করে ছোটগল্প নিয়ে সর্বমহলে এক ধরণের সংশয় কাজ করে; কথাসাহিত্য প্রসঙ্গে আলোচনায় গিয়ে আমি এখানে তাঁর প্রবন্ধ থেকে সামান্য উদ্ধৃত করছি। অতি সম্প্রতি দেশের অন্যতম সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশে ছোটগল্পের সংকট প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে ছোটগল্পকারদের ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠার বিষয়ে পত্রিকাগুলোর প্রতিযোগিতাকে কিছুটা দায়ীই করেছেন। অতি সাম্প্রতিককালে কোন কোন পত্রিকা পাঠকদের লেখা নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করছে, যেখানে অনেক পাঠকই নিজেদের গল্প পাঠাচ্ছেন এবং পুরস্কার জিতে নিচ্ছেন। পাঠকদের গল্পগুলো সবই যে নিম্নমানের অথবা নিম্নরুচির তা বলা যাবে না; সে সব গল্পের কোন কোনটি যথেষ্ট সম্ভাবনাময়, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে স্থিতির। এঁদের কতজন নিজেকে যুক্ত রাখবেন লেখালেখির সাথে, বিশেষত গল্প লেখার সাথে? সৈয়দ শামসুল হক তাঁর প্রবন্ধে বাংলাদেশের ছোটগল্প সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কথাই লিখেছেন। সাহিত্যের কাগজ ‘কালি ও কলম’র ‘ছোটগল্প সংখ্যা ২০১২’তে মুদ্রিত তাঁর সে লেখাটি পড়তে অনুরোধ করবো আগ্রহী সবাইকে।
‘আমাদের কথাসাহিত্যে তাহলে ছোটগল্পেরই ফলন বেশি। এর একটা কারণ কিংবা উৎসাহ বোধহয় এই- ছোটগল্প না হলে সাহিত্য সাময়িকী অচল, মাসিকপত্র অচল, ছোটকাগজেরও তথা বাস্তবতা। অতএব নিরন্ত চাহিদা আছে ছোটগল্পের, নতুন লেখকেরা শুরু করছেন ছোটগল্প দিয়েই। ছোটগল্পের জন্য সম্পাদক পথ চেয়ে আছেন, বেশ ব্যাকুলভাবেই; লেখা ছাপা হবার সম্ভাবনাও সেই কারণে অনেক বেশি। লেখক লিখেই চলেছেন, সম্পাদকও ছেপে দিচ্ছেন লেখাটা চলনসই হলেই- পত্রপত্রিকায় নিরন্তর যে-গল্পগুলো বেরোচ্ছে তা অভিজ্ঞ চোখে পাঠ করলেই ধরা পড়বে, এর অধিকাংশই অনেকটা কাঁচা, প্রায় শিক্ষানবিশের রচনা। তবু, পাঠযোগ্য কিছু গল্প তো আমরা পাচ্ছিই। কিন্তু সেই ছোটগল্প নিয়ে লেখক যখন বই করতে চান, নতুন লেখক হলে প্রকাশক মুখ ফিরিয়ে নেবেন; আর কিছুটা বা যথেষ্টই খ্যাতি আছে এমন লেখকের গল্পের বই প্রকাশক নিরাজি হয়ে ছাপবেন বটে, তবে এই কড়ারে যে এরপরে তাকে কিন্তু একটা আস্ত গোটা উপন্যাস দিতে হবে। কারণ, ছোটগল্পের বই বাজারে চলে না; চলে না মানে এর বিক্রিটা নেহাতই নগণ্য। প্রকাশকের কথা বিশ্বাস না করলে, আমরাও বাজারে বা বইমেলায় বেরিয়ে দেখবো ছোটগল্পের বই মোটে চলছে না। ভাবতে অবাক লাগে, যে ছোটগল্প না হলে পত্রপত্রিকা অচল, বই হয়ে বেরোলে সেই ছোটগল্পেরই সংকলন এমন বেজার বাজার পায় কী করে! বা, কেন?।’ (ছোটগল্প: কথা কতিপয় ॥ সৈয়দ শামসুল হক ॥ কালি ও কলম-ভাদ্র ১৪১৯ ॥ ছোটগল্প সংখ্যা ২০১২)
সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হক-এর আরও এক সৃজন আঙিনা গীতিকবিতা ও চিত্রনাট্য। ষাটের দশকে বেশকিছু চলচ্চিত্রের কাহিনি, চিত্রনাট্য এবং গীত রচনার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সে সব চলচ্চিত্র দর্শকের কাছে আজও চিরসবুজ চলচ্চিত্র হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে। আমরা বরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সুতরাং’ ছবিটির কথা স্মরণ করতে পারি। সুতরাং ছবির কালজয়ী গানগুলোর রচয়িতা সৈয়দ শামসুল হক।
পরাণে দোলা দিলো এ কোন ভ্রমরা (২)
ও সে ফুলের বনে গুঞ্জরিয়া যায়
কী করি উপায়
বলিতে শরম লাগে ॥
বনের পাখি বলে হারিয়ে যাবো
আমার এ আকুলতা কেমনে জানাবো।

কতো সহজেই স্মৃতির জানালায় উঁকি দিয়ে যায় সেই গান–
তুমি আসবে বলে কাছে ডাকবে বলে
ভালোবাসবে ওগো শুধু মোরে
তাই চম্পা বকুল করে গন্ধে আকুল
এই জ্যোৎস্না রাতে মনে পড়ে ॥
চঞ্চল হাওয়া বয় কানে কানে কথা কয়
বনে বনে চাঁদ হাসে দূরে কেন সরে রয়।
তুমিও তেমনি এমন রাতে রবে কি দূরে দূরে ॥

অথবা স্মরণ করতে পারি যুগলকণ্ঠের সেই গান–
চাঁদ বাঁকা জানি নদী বাঁকা জানি
তার চেয়ে অধিক বাঁকা তোমার ছলনা
চাই কী তোমার বুঝিয়ে বল না ॥
ও রশিক রাজা তোমার ভালোবাসা
মুখের যত বড় বুলি কাজের কিছু নাই।
আমি আনতে পারি ঢাকাই শাড়ি গহনা ॥
মান কর কেন আরো দেবো শোন
মন পাখিরে শিকল বেঁধে তোমার পিঞ্জিরায়
চাই কী তোমার বুঝিয়ে বল না ॥
আমরা আশির দশকের প্রথম দিকে মুক্তি পাওয়া মহিউদ্দীন আহমদ-এর ‘বড় ভালো লোক ছিলো’ ছবির ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুষ দম ফুরাইলেই ঠুস/ তবু তো ভাই কারোরই নাই একটুখানি হুঁশ/ হায়রে মানুষ রঙিন ফানুষ।/ পূর্ণিমাতে ভাইসা গেছে নীল দরিয়া/ সোনার পিদিম জ্বালাইছিলা যতন করিয়া।/ চেলচেলাইয়া জ্বলে পিদিম নিভ্যা গেলেই ফুস ॥’ এই মুহূর্তে আরও একটি গানের কথা মনে পড়ছে, ‘চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা/ নদীর সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা/ তুমি চাঁদ হতে যদি দূরে চলে যেতে/ তুমি নদী হতে যদি দূরে বয়ে যেতে/ সে কথা কেন বোঝ না/ তুমি যে তোমার তুলনা ॥’ এমনি বেশ কিছু কালজয়ী গানের গীতিকার সৈয়দ শামসুল হক খুব বেশি গীত রচনা করেননি, কিন্তু যে ক’টি গীত তিনি রচনা করেছেন প্রত্যেকটিই আমাদের সঙ্গীতাঙ্গনের সম্পদ।
সাহিত্যের যে ক’টি শাখায় হাত দিয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক, প্রতিটি শাখায় সোনা ফলেছে। তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে বলতে চাই, বহুবর্ণিল বৈচিত্র্যঋদ্ধ সব্যসাচী সৃজনশিল্পী সৈয়দ শামসুল হক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে দ্যুতি ছড়াচ্ছেন সাহিত্যের বিস্তীর্ণ আঙিনায়। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখার পাঠক তাঁকে পাঠ করবেন শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায়। > ফরিদ আহমদ দুলাল, বিডি নিউস ২৪  সৌজন্যে



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৭ তে বিতরণকরা নতুন বইয়ে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা ১৭ টি প্রবন্ধ বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামী মৌলবাদী লেখা যোগ হয়েছে, আপনি কি এই পুস্তক আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুমোদন করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ