২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৫ম বর্ষ ৪৭শ সংখ্যা: বার্লিন, শনিবার ১৯নভে –২৫নভে ২০১৬ # Weekly Ajker Bangla – 5th year 47th issue: Berlin, Saturday 19 Nov–25 Nov 2016

রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শততম বছর

অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব

প্রতিবেদকঃ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তারিখঃ 2016-11-19   সময়ঃ 00:15:56 পাঠক সংখ্যাঃ 398

সেই ষাটের দশকে যখন থেকে আমার রাজনীতিতে হাতেখড়ি, তখন থেকেই ‘৭ই নভেম্বর’ তারিখটিকে মহান ‘রুশ বিপ্লব’ তথা মহান ‘অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব’ দিবস হিসেবে পালন করে আসছি। যখন যেখানে ও যে অবস্থায়ই ছিলাম না কেন, হোক গোপনে বা প্রকাশ্যে, কিম্বা জেলখানায় বা রণাঙ্গনে—এ দিবসটি পালনে কোনো বছরই ব্যত্যয় হয়নি। ৯৯ বছর আগে ১৯১৭ সালে রুশ দেশে সংঘটিত এই ‘বিপ্লব দিবসের’ শততম বছরের সূচনা হয়েছে গত সপ্তাহে। গোটা বছর ধরে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে তার শতবর্ষ পালন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে সিপিবিসহ অসংখ্য সংগঠন।
এই ‘৭ই নভেম্বর’ আজ অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে অন্য একটি ৭ই নভেম্বরের ঘটনাবলীর কারণে। সে ঘটনা ঘটেছিল বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালে। দিনটিকে ‘জাতীয় সংহতি দিবস’, ‘সিপাহী বিপ্লব দিবস’, ‘সিপাহী জনতার বিপ্লব দিবস’, ‘মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস’ ইত্যাদি বহুমুখী বিতর্কিত নামে অভিহিত করে জাঁকজমকের সাথে পালন করা হয়ে থাকে। ফলে শতবর্ষ আগের ১৯১৭ সালের ‘রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের’ কথাটি জনগণের কাছে বহুলাংশে অজানা থেকে যাচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ৭ই নভেম্বরকে ‘রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব’ বার্ষিকী হিসেবে পালন করা কখনই বন্ধ হয়নি। কারণ মানব ইতিহাসের এই যুগান্তকারী মহত্ দিবসটির তাত্পর্য ও প্রাসঙ্গিকতা নিঃশেষ হবার নয়। তা নিয়ে আজ সাধারণ দু’চারটি কথা লিখছি।
যুগ যুগ ধরে মানুষ শোষণহীন, সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্ন দেখেছে। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন কার্ল মার্কস-ফ্র্রেডারিখ এঙ্গেলস। তাঁদের মতাদর্শকে ধারণ করে কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিনের পরিচালনায় ও বলশেভিক পার্টির (কমিউনিস্ট পার্টির) নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে, পুরনো জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ২৫ অক্টোবর, আর নতুন গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জি অনুসারে ৭ নভেম্বর, রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। এ কারণে ৭ নভেম্বর সংঘটিত এ বিপ্লবকে মহান ‘অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই বিপ্লব প্রকৃতই মানব জাতির ইতিহাসে সূচনা করেছিল এক নতুন যুগের।
অক্টোবর বিপ্লবই প্রথম সফল বিপ্লব, যার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল শোষণহীন এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা। সূচিত হয়েছিল শোষণমুক্ত সমাজের দিকে যাত্রা। এই বিপ্লব পুঁজিবাদের ভিত্তিমূলে বড় রকমের এক ভাঙন ও চিড় ধরিয়েছিল। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়েছিল বিশ্বের বিপুল সংখ্যক মানুষকে। মানুষ পেয়েছিল মুক্তির স্বাদ। কায়েম হয়েছিল শোষিত শ্রমিক শ্রেণির রাজত্ব। পূর্ববর্তী সকল বিপ্লব থেকে অক্টোবর বিপ্লবের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো, আগের সব বিপ্লব কেবল শাসকশ্রেণির পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছে। কিন্তু সংখ্যালঘিষ্ঠের দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠের উপর শোষণের অবসান ঘটাতে পারেনি। অন্যদিকে অক্টোবর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শুধু শোষক-শাসক শ্রেণির ও সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনই ঘটেনি, সূচনা হয়েছিল মানুষের ওপর মানুষের শোষণের চির অবসানের যুগ। সূচিত হয়েছিল শ্রেণিহীন সমাজ নির্মাণের পথে যাত্রা।
অক্টোবর বিপ্লবের আগে রাশিয়া ছিল পিছিয়ে থাকা একটি দেশ। রাশিয়াকে বলা হতো ‘ইউরোপের পশ্চাত্ভূমি’। জারের আমলে (সেদেশের বাদশাহকে জার বলা হতো) অনাহার, দারিদ্র্য ও অসহনীয় শোষণ ছিল জনগণের নিত্যসঙ্গী। উন্নত শিল্প দূরের কথা, সাধারণ মাপের শিল্প উত্পাদনের ব্যবস্থাও তখন ছিল না। দ্য ‘গ্রেট রাশিয়ানদের’ দ্বারা অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলো শোষিত হতো। জারশাসিত রাশিয়ায় সামান্যতম গণতান্ত্রিক অধিকারও ছিল না। জারের শাসনের ভিত্তি ছিল বৃহত্ জমিদারতন্ত্র।
রাশিয়ার বিপ্লবী শক্তিগুলো, বিশেষত বলশেভিক পার্টি তথা কমিউনিস্ট পার্টি জার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলে। এসব সংগ্রাম ধীরে-ধীরে বিপ্লবের রূপ নেয়। ১৯০৫ সালে এরূপ এক বিপ্লব ব্যর্থ হয়। তারপর, ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরেকটি বিপ্লব হয়। সেই বিপ্লবে জার স্বৈরতন্ত্র উত্খাত হয় এবং ‘অস্থায়ী সরকার’ গঠিত হয়। সে সরকার ছিল বুর্জোয়া শ্রেণি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই সরকার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর সাথে আপস করে। বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার পথে অগ্রসর হয় এবং ক্রমশই গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ‘অস্থায়ী সরকার’ শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে পড়ে। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর সেদেশে শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের নতুন এক ধরনের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক সংস্থা হিসেবে ‘সোভিয়েত’ গড়ে ওঠে। সোভিয়েতগুলোর মধ্যে বলশেভিক পার্টির অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে।
‘সোভিয়েতগুলোর হাতে সমস্ত ক্ষমতা দাও’—এই আহ্বানে বলশেভিক পার্টি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। শ্রমিক বিক্ষোভ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সৈনিকরাও ক্ষোভে ফেটে পড়তে শুরু করে। ১০ অক্টোবর লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর) শ্রমিকদের সশস্ত্র অংশ এবং বিপ্লবী সেনারা অস্থায়ী সরকারকে উত্খাত করতে প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। রাত ৯ টা ৪৫ মিনিটে যুদ্ধ-জাহাজ ‘অরোরা’ থেকে একটা ফাঁকা শেল নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে বিপ্লবী সৈনিক (যারা আসলে উর্দি পরা কৃষক) ও রেড গার্ড বাহিনীর সহায়তায় রাজধানী পেট্রোগ্রাডের শ্রমিকরা বুর্জোয়া সরকারের কেন্দ্র ‘উইন্টার প্যালেসে’ অভিযান শুরু করে। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই পতন হয় ‘উইন্টার প্যালেসের’। ‘অস্থায়ী সরকারের’ হাত থেকে ক্ষমতা চলে আসে শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের ‘সোভিয়েতের’ হাতে। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে প্রতিবিপ্লবীদের প্রতিরোধ ভেঙে মস্কো, গোটা রাশিয়া এবং পুরনো জার সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশে বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণি ক্ষমতা দখল করে নেয়।
বিপ্লবের পরে লেনিনের নেতৃত্বে জনগণের কমিশারদের পরিষদ নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়। জমি, শান্তি ও রুটির শ্লোগানে বলশেভিকরা জনগণকে সংগঠিত করেছিল। নতুন সরকারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল জমি ও শান্তির জন্য ডিক্রি জারি করা। ‘শান্তির ডিক্রি’র মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য অবিলম্বে শান্তি আলোচনা শুরুর ডাক দেওয়া হয়। ‘জমির ডিক্রি’র মাধ্যমে খোদ কৃষককে জমির ওপর অধিকার প্রদান করা হয়। অন্যান্য ডিক্রিগুলো ছিল নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, অবৈতনিক চিকিত্সা ও স্বাস্থ্যরক্ষা এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের নতুন ইউনিয়ন গঠন সম্পর্কিত।
মহান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের পর সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের কাজ শুরু করার আগেই অক্টোবর বিপ্লব প্রতিবিপ্লবী শক্তির আক্রমণের মুখে পড়ে। অন্তত ১৪টি সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দেশের সামরিক বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আগ্রাসন শুরু করে। এদের সাথে যুক্ত হয় দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতাচ্যুত শাসকশ্রেণির অনুগত শ্বেত সেনাবাহিনী। বেঁধে যায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। চার বছরের গৃহযুদ্ধের পর ‘লাল ফৌজ’ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ধ্বংস করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ‘লাল ফৌজে’র হাজার হাজার যোদ্ধাকে প্রাণ দিতে হয়। সোভিয়েত বিরোধী চক্রান্ত ঘৃণ্যরূপ ধারণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। হিটলারের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদ বিশ্বকে গ্রাস করতে যুদ্ধ শুরু করে দেশের পর দেশ দখল করে নিতে থাকে। কিন্তু সোভিয়েত ‘লাল ফৌজে’র বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কাছে ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল হিটলারের বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। তিন কোটি মানুষের প্রাণের বিনিময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন রক্ষা করে বিশ্বকে, মানব সভ্যতাকে। মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের অমূল্য অবদানের কারণেই বিংশ শতাব্দীর মহাবিপদ ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করা সম্ভব হয়।
এসব প্রবল বাধা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে। মাত্র দুই দশকের মধ্যেই দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। শোষিত-বঞ্চিত সকল শ্রেণি নির্মম শোষণ থেকে মুক্তি পায়। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা হয় কাজ, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিত্সাসহ সাধারণ মৌলিক চাহিদা। এক দশকের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করা হয়। কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য আসে। নতুন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে। দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক সরকার ১৯২৭ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। দু-তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়। ১৯২৯-৩৩ সালের মহামন্দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত পুঁজিবাদী দেশ আক্রান্ত হয়ে পড়লেও, এই মহামন্দা সোভিয়েত ইউনিয়নকে স্পর্শ করতে পারেনি। এসবের ফলে সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মর্যাদা গোটা বিশ্বে আরো ছড়িয়ে পড়ে।
সমাজতন্ত্র প্রতিটি নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যা অর্জনের ব্যবস্থা করে দেয়, মানুষকে দীর্ঘায়ু দান করে, নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার, শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষকে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদান এবং বঞ্চিত ও নিপীড়িত জাতিসমূহকে মুক্ত করে। সকল প্রকার পুরানো সংস্কৃতি যেমন গোষ্ঠীবাদ, জাতীয়তাবাদ, সংকীর্ণতাবাদ ইত্যাদির অপসারণ করা হয়। প্রতিক্রিয়াশীলতা, ভোগবাদ, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে ব্যাপক সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটানো হয়। প্রলেতারিয়েতের মধ্যে নতুন চেতনা, মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদার উন্মেষ ঘটে। নিপীড়িত মানুষের শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। শুধু শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও ঘটে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চা অগ্রসর করা হয়। মহাবিশ্বকে স্পর্শ করে স্পুটনিক। ১৯৫৯ সালে মহাশূন্যে প্রথম পাড়ি দেয় সোভিয়েত নভোচর ইউরি গ্যাগারিন। সব মিলিয়ে সোভিয়েত ব্যবস্থা উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন সৃষ্টি করতে থাকে নতুন মানুষ। একটি পিছিয়ে পড়া দেশ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে ওঠে একটি ‘পরাশক্তি’।
অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। উপনিবেশিক দেশগুলোতে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম তীব্রতা লাভ করে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই বেগবান হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপসহ বিশ্বের প্রায় এক ডজন দেশ সমাজতন্ত্রের পথ গ্রহণ করে। চীনে বিপ্লব সফল হয়। গড়ে ওঠে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা। এশিয়া, আফ্রিকার শতাধিক দেশ অর্জন করে রাজনৈতিক স্বাধীনতা। সদ্য স্বাধীন এইসব দেশের জাতীয় অর্থনীতির পুনর্গঠনেও সোভিয়ত ইউনিয়ন আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে। ঔপনিবেশিক ও নয়া-ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর পক্ষে দাঁড়ায় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এবং পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তা এর একটি অকাট্য প্রমাণ।
অক্টোবর বিপ্লবের মহান আদর্শ, সমাজতন্ত্রের মহান নীতিগুলো আজও অম্লান। সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী ষড়যন্ত্র ও সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে নানা ভুল-ত্রুটির কারণে আজ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটেছে। সে সব ভুল-ত্রুটি সম্পর্কে খোলামেলা আত্মপর্যালোচনা প্রয়োজন। সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা প্রয়োজন। সোভিয়েতের বিলুপ্তির কারণ তার লক্ষ্য ও তত্ত্বের মধ্যে ছিল না। বিলুপ্তির কারণ ছিল প্রয়োগে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর পুঁজিবাদপন্থি অনেক পণ্ডিত সমাজতন্ত্রকেই নাকচ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ যে সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম ও প্রাসঙ্গিকতা বিলুপ্ত হওয়া বোঝায় না, তার নিদর্শন আজ আমরা দেশে দেশে, এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখতে পাচ্ছি।
বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এখন গভীর সংকটে। একবিংশ শতাব্দীতে নয়া উদারনীতিবাদ গোটা পৃথিবীতে বৈষম্য বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ৬৬টি ধনী পরিবারের কাছে যে সম্পদ আছে, তা ৩৫০ কোটি মানুষের মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। কয়েক বছর আগে বিশ্ব পুঁজিবাদ ভয়াবহতম অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল। তখন খোদ যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে উঠেছিল ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ মুভমেন্ট, ‘ধনী ১ শতাংশের বিরুদ্ধে বাকি ৯৯ শতাংশের’ লড়াই। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবারকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের একজন মনোনয়ন প্রত্যাশী বার্নি স্যান্ডার্স প্রকাশ্যে ‘সমাজতন্ত্রের’ কথা ও ‘রাজনৈতিক বিপ্লবের’ প্রয়োজনীয়তার কথা বলে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের পরাজয়ের পর কথা উঠেছে যে সমাজতন্ত্রী বার্নি স্যান্ডার্সের পক্ষেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিপজ্জনক প্রার্থীকে পরাজিত করা সম্ভব ছিল। সেদেশে তরুণদের কাছে সমাজতন্ত্র জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মহান ‘অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব’ যে স্বপ্ন দেখিয়েছে ও দেখিয়ে চলেছে, তা বেঁচে থাকবে চিরকাল। মুক্তিকামী মানবতার কাছে তার অবদান অনিঃশেষ।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্যে
E-mail: selimcpb@yahoo.com
 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৭ তে বিতরণকরা নতুন বইয়ে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা ১৭ টি প্রবন্ধ বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামী মৌলবাদী লেখা যোগ হয়েছে, আপনি কি এই পুস্তক আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুমোদন করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ