১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৫ম বর্ষ ৪৯শ সংখ্যা: বার্লিন, শনিবার ০৩ডিসে –০৯ডিসে ২০১৬ # Weekly Ajker Bangla – 5th year 49th issue: Berlin, Saturday 03 Dec–09 Dec 2016

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী লেখক

একমাত্র সাচ্চা মার্কসবাদী

প্রতিবেদকঃ মোনাজ হক তারিখঃ 2016-12-04   সময়ঃ 02:37:22 পাঠক সংখ্যাঃ 360

জীবন অন্বেষণের কথাশিল্পী মানিক বন্দোপাধ্যায় ১৯৫৬ সালের আজকের এই দিনে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যান। ওই অল্প সময়ে তিনি বাঙালিকে যা দিয়েছেন তার কোনো পরিসংখ্যান দরকার করে না। শুধু এতটুকু অকপটে স্বীকার করে নিতে হয়- বাংলা সাহিত্যে গত শতাব্দীর সত্তর দশক পর্যন্ত একমাত্র সাচ্চা মার্কসবাদী। স্যালুট কমরেড! 'প্রাগৈতিহাসিক' থেকে আজ অব্দি আমরা তোমার 'পুতুলনাচের ইতিকথা' শুনে এবং শুনিয়ে চলেছি (ছবি যুগান্তরের সৌজন্যে)

চরম দারিদ্রের মধ্যে থেকেও সাহিত্য কর্মকেই জীবন ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে যিনি বেছে নিয়েছিলেন তিনি হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার প্রকৃত নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষের অবচেতন মনে যে নিগুড় রহস্যলীলা প্রচ্ছন্ন থাকে তার নিপুণ বিশ্লেষণ উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর লেখায়। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ’পদ্মা নদীর মাঝি ’। ষাটটি গ্রন্থ ও অসংখ্য অগ্রন্থিত রচনার প্রণেতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কর্মগুলো হচ্ছে- জননী, দিবারাত্রির কাব্য, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিহ্ন, চতুষ্কোণ, জীয়ন্ত, সোনার চেয়ে দামী ইত্যাদি। ১৯০৮ সালের ১৯শে মে এই সাহিত্যিকের জন্ম দিন। 

(এই নিবন্ধের নিচের অংশটি ভোরের কাগজ থেকে সংকলিত)

১৯৫৪ সালে ‘কেন লিখি’ নামে একটি সংকলন বেরিয়েছিল ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের পক্ষে। সংকলনটির সম্পাদক ছিলেন হিরণকুমার সান্যাল ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়। ‘বাংলাদেশের বিশিষ্ট কথাশিল্পীদের জবানবন্দি’- এই ঘোষণা থাকলেও সংকলনটিতে কথাশিল্পীদের সঙ্গে কবিরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ওই সংকলনটিতে অন্যদের সঙ্গে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও একটি লেখা লিখেছিলেন। নিতান্তই ফরমায়েশি রচনা। কিন্তু বাস্তবিকই সেটি ছিল তাঁর অসাধারণ রচনা। তার মধ্যে প্রতিভাসিত হয়েছে শিল্পীমাত্রই, কিন্তু বিশেষভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে

সুন্দর সমাজ সচেতন জীবন ঘনিষ্ঠ সাহিত্যকর্মে নিবেদিত প্রাণ লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৬৫)-এর জন্ম হয়। আসল নাম সুবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হিসাবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়। পিতার চাকরি সূত্রে সাঁওতাল পরগনার দুমকায় তাঁর পরিবার চলে আসেন। এইখানেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। কিন্তু পূর্ববঙ্গের নদীনালা, খালবিল, তেলে-জলেই তিনি বড় হয়ে ওঠেন। তাই সেই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কথা, জীবন, পারিপার্শ্বিক চিত্রগুলো নিপুণ দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন। অসংখ্য অভিজ্ঞতার ভারে নুইয়ে পড়া মানিক পাঠককে তার অভিজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ রাখতেই লেখা শুরু করেন। সামাজিক শ্রেণি বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার তার লেখনি মার্কসবাদে দীক্ষা নেয়। জীবনের একটা পাঠান্তর হিসেবে ধরে নেয়া যায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৩৫ সাল থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। তিনি যখন সাহিত্য জগতে প্রবেশ করেন, তখন ফ্রয়েডীয় মনোবিকারতত্ত্ব সাহিত্যিক মহলে খুব জনপ্রিয়তা পান এবং এবং পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত তার লেখনীতে বিশাল বিস্তীর্ণ নদ-নদীর পটভূমিকায় সাধারণ মানুষের কথা যেমন বস্তুনিষ্ঠ জীবনচিত্র অঙ্কন করেছেন, তেমনি মানুষের কর্মে পিপাসায় জীবনচিত্র তুলে ধরতে গিয়ে আদিমতার অন্ধকারে ফিরে গেছেন বার বার। অদ্ভুত নিরাসক্তভাবে তিনি মানুষের জীবন ও সমস্যাকে দেখেছেন, সমাধানের চেষ্টাও করেছেন বুদ্ধি ও লেখনীতে। নর-নারীর জৈবসত্তা বিকাশের নানাদিক তাকে আকৃষ্ট করেছিল। তার লেখায় জৈবসত্তা ও দৈহিক বর্ণনায় ছিলেন কিছুটা বেপরোয়া প্রকৃতির।

দৈহিকভাবে অসুস্থ হলেও মানসিকভাবে যথেষ্ট বলিষ্ঠ ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বলিষ্ঠতা রক্তের উষ্ণ-স্রোত উত্তাপ টের পাওয়া যায় তার গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের বর্ণনায়, পেশায়, কাজে-কর্মে। মানিকের সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশটা একটা চমক এবং চমক ‘অতসী মামী’ রচনার ইতিহাস, চমক ‘দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫), ‘জননী’ (১৯৩৫), ‘পদ্মানদীর মাঝি’ (১৯৩৬), ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ (১৯৩৬), ‘অহিংসা’ (১৯৪৮) ও চতুষ্কোণ (১৯৪৩) প্রভৃতি। পাঠকের চেতনাকে নাড়া দিতে পেরেছেন বলেই এগুলো পাঠকের কাছে আদরণীয়।

‘অতসী মামী’ গল্পের মাধ্যমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যাঙ্গনে যাত্রা। পরবর্তীতে তিনি ‘প্রাগৈতিহাসিক’ ‘সরীসৃপ’ ‘হারাধনের নাতজামাই’ ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ ‘ফেরিওয়ালা’ ‘বৌ’ ‘সমুদ্রের স্বাদ’-এর মতো জীবন-সমৃদ্ধ শিল্পসার্থক গল্প লিখলেন। তাঁর এই সফলতা ও সার্থকতার কারণ রয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতার পসরা ছিল বিচিত্র ও বিস্তীর্ণ। মধ্যবিত্ত অভিযাত্রিক সচেতনতার মধ্যে জন্ম বর্জিত হলেও বিত্তের অসচ্ছলতার চাপ শিল্পীকে ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করতেই হয়েছে প্রায় আগাগোড়া। এককথায় মানবিক বিশ্বাসের মূলে চিড় ধরেছিল। আসলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মানব সত্যের প্রাণ ও স্বপ্নপুরুষ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন অভিজ্ঞতা ছিল ব্যাপক ও গভীর। ফলে তিনি জীবনের দিকটি দেখতেন তার সমগ্রতায়, খণ্ড খণ্ড করে নয়, অখণ্ডতায়। এটি তাঁর প্রধান গুণ এবং লেখক মাত্রেরই শ্রেষ্ঠ গুণ। তিনি যেমন ফ্রয়েডীয় মতবাদে প্রভাবিত হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি জীবনের, মনুষ্য জীবনের মুক্তি দেখেছিলেন মার্কসবাদে। মার্কসবাদই তাঁকে দীক্ষা দেয়। এই মতবাদেই তিনি জীবন ও জগৎ সম্পর্কে যে বিশ্বাস পোষণ করেন, তাই তাঁর সাহিত্য জীবনের পাথেয়। মনে রাখতে হয়, ব্যক্তিগতভাবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মধ্যবিত্ত মানসিকতারই উত্তরাধিকারী। তাঁর প্রথম গল্পগুচ্ছ ‘অতসী মামী ও অন্যান্য’ সংকলনে সব কয়টি গল্প এবং প্রথম উপন্যাস ‘দিবারাত্রির কাব্য’ মধ্যবিত্ত জীবনভিত্তিক কাহিনী নিয়ে গড়া। মানিক বন্দোপাধ্যায় যখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের মুখে এসেছিলেন, তখন থেকেই বাঙালির মধ্যবিত্ত জীবনে সার্বিক অবক্ষয়ের চেতনা চারপাশ হতে ঘিরে চেপে বসতে চাইছিল। বিশ্বজোড়া মধ্যবিত্ত বৈমানসিকতা বোধের তাড়নায় বাংলা সাহিত্য তখন পীড়িত। পাঠকের অভিজ্ঞতাতেও এ নিয়ে তারতম্য ছিল না। তবু তাঁর অন্তরের আকাক্সক্ষা ছিল অন্ধকারের নিরবচ্ছিন্নতাকে উতরিয়ে উত্তরণের পথ খোঁজার। সে জন্যই তিনি চিরস্মরণীয় ও বরণীয়।

ছোটগল্প রচনায় রোমাঞ্চ আছে। এতে গভীর মনোসংযোগ করতে হয়। এত দ্রুত তালের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে চলতে হয় বলেই মন কখনো বিশ্রাম পায় না। ছোটগল্প লেখার সময়ে প্রতি মুহূর্তে রোমাঞ্চ বোধ করি।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবদ্দশায় তার ১৬টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পগুলোর নাম নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

১. অতসী মামী (১৯৩৫), ২. প্রাগৈতিহাসিক (১৯৩৭), ৩. মিহি ও মোটা কাহিনী (১৯৩৮), ৪. সরীসৃপ (১৯৩৯), ৫. বৌ (১৯৪০/দ্বিতীয় সং ১৯৪৬), ৬. সমুদ্রের স্বাদ (১৯৪৩), ৭. ভেজাল (১৯৪৪), ৮. হলুদপোড়া (১৯৪৫), ৯. আজ কাল পরশুর গল্প (১৯৪৬/দ্বিতীয় সং ১৯৫০), ১০. পরিস্থিতি (১৯৪৬), ১১. খতিয়ান (১৯৪৭), ১২. মাটির মাশুল (১৯৪৮), ১৩. ছোট বড় (১৯৪৮), ১৪. ছোট বকুলপুরের যাত্রী (১৯৪৯), ১৫. ফেরিওলা (১৯৫৩/দ্বি-সং ১৯৫৫), ১৬. লাজুকতা (১৯৫৪)। এই ষোলটি গল্পগ্রন্থে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় ২০০টি গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৭ তে বিতরণকরা নতুন বইয়ে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা ১৭ টি প্রবন্ধ বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামী মৌলবাদী লেখা যোগ হয়েছে, আপনি কি এই পুস্তক আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুমোদন করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ