২০ নভেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৫ম বর্ষ ৪৯শ সংখ্যা: বার্লিন, শনিবার ০৩ডিসে –০৯ডিসে ২০১৬ # Weekly Ajker Bangla – 5th year 49th issue: Berlin, Saturday 03 Dec–09 Dec 2016

জীবন যদি কোথাও থেকে থাকে, তবে তা ক্রোমোসোমের ভেতর

ডিএনএ’ আর প্রোটিনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে জীবনের সব রহস্য

প্রতিবেদকঃ নাসরিন তসলিমা তারিখঃ 2016-12-08   সময়ঃ 11:32:36 পাঠক সংখ্যাঃ 334

সভ্যতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সাধনায় বিজ্ঞান দিয়েছে মানুষকে আলোর সন্ধান, আর তাই মানুষ বুঝতে শিখেছে, জীবন যদি কোথাও থেকে থাকে, তবে তা ক্রোমোসোমের ভেতর।

ক্রোমোসোমে দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বসবাস। প্রোটিন আর ডিএন এ। পঞ্চাশের দশকে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, জীবনের খোঁজ যদি করতে হয়, প্রোটিনের ভেতর করাই ভালো। আমাদের শরীরে অগুণতি প্রোটিনের আবাস। তাদের গঠনও অনেক জটিল। আর জীবনও তো কোন সহজ বিষয় না। কাজেই, প্রোটিনের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে জীবনের সব রহস্য। ডিএনএ’র গঠন সেই তুলনায় অনেক সহজ।

এ্যাডেনিন, গুয়ানিন,সাইটোসিন আর থাইমিন দিয়ে তৈরি এই ডিএনএ। এতো সিম্পল একটা জিনিসের ভেতর কি জীবন থাকবে? সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরও কেউ কেউ ডিএনএর গঠনের মধ্যেই জীবনের রহস্য খুঁজে বেড়াতে লাগলেন।

ওয়াটসন আর ক্রীক যেমন। এদের নাম শোনেনি, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। দু’জনেই ছিলেন কেমব্রিজের গবেষক। সেই কেমব্রিজ যেখানে গত সাতশো বছর ধরে বড় বড় আবিষ্কারগুলো হয়ে আসছে। কিন্তু ওয়াটসন আর ক্রীক---দু’জনেই ছিলে অলসের হাড্ডি। ক্যাম্পাসে এদের পরিচিত ছিল lazy joker. ক্রীক তো তার পিএইচডি-ই শেষ করতে পারেননি। এদের মধ্যে একটাই মিল। এরা স্বপ্ন দেখতে জানতেন। এদের স্বপ্ন ছিল জীবনের রহস্য খুঁজে বের করা। আর ছিলেন কিংস কলেজের দুই বিজ্ঞানী। রোজলিন ফ্র্যাঙ্কলিন আর মরিস উইলকিন্স। মরিস উইলকিন্স দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমা প্রজেক্টের সাথে জড়িত ছিলেন। এর ভয়াবহতা তাকে এতোটাই প্রভাবিত করে যে, তিনি এবার মৃত্যু ছেড়ে জীবনের গবেষণায় মনোযোগ দেন। তার গবেষনার বিষয়বস্তুও হয়ে ওঠে জীবনের রহস্য তথা ডিএনএ।

ডিএনএ দৌড়ে আরো সামিল ছিলেন লিনাস পাউলিং। পাউলিং ছিলেন সেকালের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের একজন। বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর একটা বড় অংশ হয় দুর্ঘটনাক্রমে। পাউলিং এইসব মিরাকল বা দুর্ঘটনায় বিশ্বাস করতেন না। উনার ফিলোসফি ছিল---যাই আবিষ্কার করবেন, বুঝেশুনে আবিষ্কার করবেন। পাউলিং ই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এককভাবে দুইবার নোবেল পেয়েছেন। একবার কেমিস্ট্রিতে, আরেকবার শান্তিতে। কাজেই এই রেসে তিনি ছিলেন শক্ত প্রতিদন্দ্বী।

পাউলিং এর কাছে ডিএনএ ছিল আর দশটা অণুর মতই একটা অণু মাত্র। সোডিয়াম ক্লোরাইড যেমন। উনি ডিএনএ’র একটা মডেল দাঁড় করালেন। পরমাণু বিজ্ঞানীরা যেমন মডেল দাঁড় করান, অনেকটা সেরকম। কতগুলো বল একে অন্যের সাথে একটা কাঠি বা দণ্ড দিয়ে যুক্ত। বলগুলো হচ্ছে এক একটা পরমাণু। আর কাঠিগুলো তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব। গোটা ব্যাপারটা ছিল একটা জিগস পাজল সল্ভ করার মত। তাও আবার ত্রিমাত্রিক জিগস পাজল। উইলকিন্স এই কাজের জন্যই পুরোপুরি অন্য রাস্তা বেছে নিলেন। ডিএনএ’র গঠন দেখার জন্য একে এক্স রে দিয়ে আঘাত করলেন।। সেই রশ্মি ডিএন এ তে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেত। অন্য পাশে একটা ফটোগ্রাফিক প্লেট রাখলে দেখা যেত সেই ছড়ানো ছিটানো রশ্মি মিলে একটা প্যাটার্ণ তৈরি করেছে। এখন ডিএনে’র ছবি তোমার মত কোন ক্যামেরা যেহেতু আমাদের কাছে নেই, সেই প্লেটে পড়া প্যাটার্ণ দেখেই আমাদের আন্দাজ করতে হবে এর গঠনটা কেমন হতে পারে। একটা ঝাড়বাতির কথা ধরা যাক। মনে কর, সেই ঝাড়বাতির উপর একটা আলো ফেলা হল। সেই আলো ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাবে। গিয়ে দেয়ালের উপর পড়বে। এখন সেই দেয়ালে পড়া আলো দেখে আমাদের ঝাড়বাতির স্ট্রাকচার বুঝে নিতে হবে। ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও সহজ নয়।

ওয়াটসন আর ক্রীক ঠিক প্রশ্ন করতে জানতেন। তাদের মনে প্রশ্ন ছিল---সব রকমের প্রাণে কমন জিনিসটা কী? দেয়ার সুড বি এ্যা স্ক্রিপ্ট। ওয়াটসন ক্রিকের সামনে এখন দুটো পথ খোলা। আধুনিক আবিষ্কারগুলো এই দুটো পথের একটাকে ফলো করেই এসেছে। এক হল, এক্স রে’র সাহায্যে হাজার হাজার ডাটা নিয়ে সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে একটা প্যাটার্ণে আসা। আরেকটা হল সামান্য কিছু ডাটা কালেক্ট করে পাউলিং এর মত একটা মডেল দাঁড় করানো। ওয়াটসন-ক্রীক কোন পথে গেলেন? অবশ্যই মডেল দাঁড় করানোর পথে। তাদের মত অলস মানুষ হাজার হাজার ইমেজ এ্যানালাইসিস করার প্যারা নিতে যাবেন কেন? তারা যতোটা না এক্সপেরিমেন্টে সময় দিতেন, তার চেয়ে গল্প করতেন বেশি। যাকে বলে ব্রেইনস্টর্মিং। এই নিয়ে লোকে হাসাহাসিও করতো। দুনিয়া যেখানে কাজ করে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তারা সমস্ত দিন কেবল হাঁটছেন আর কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন। ওয়াটসন ক্রীক এগুলোতে বিশেষ পাত্তা দিতেন না। ঠিক প্রশ্নটি করাই ছিল তাদের জীবনের লক্ষ্য। তারা জানতেন ঠিক প্রশ্নটি করা গেলে উত্তরও একদিন না একদিন পাওয়া যাবে।

প্রাণের মধ্যে কমন কিছু আছে? কোন স্ক্রিপ্ট? তাদের ধারণা ছিল, এটা ডিএনএ। কিন্তু এই ডিএনএ দেখতে কেমন? সেটা নিজেকে কপিই বা করে কীভাবে? এইসব প্রশ্ন তাদের মগজের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল।

এদিকে কিংস কলেজে তখন উইলকিন্স আর ফ্র্যাঙ্কলিনের মধ্যে মন কষাকষি চলছে। উইলকিন্সের বস তার করা ইমেজগুলো ভালোমত এ্যানালাইসিসের দায়িত্ব দেন রোজলিন ফ্র্যাংকলিনকে। তিনি সেটা মন দিয়ে করছিলেনও। উইলকিন্স ভাবতেন, তিনিই এই প্রজেক্টের হেড। এদিকে তার বস ফ্র্যাঙ্কলিনকে এই ধারণা দিয়ে রাখেন, যে ফ্র্যাঙ্কলিনই প্রজেক্ট হেড। ফ্রাঙ্কলিন আর উইলকিন্স নিয়মিত তাদের কলিগদের সামনে প্রেজেন্টেশান দিতেন। গড়পড়তা ৩০ জন বিজ্ঞানী থাকতেন সেখানে। সবাই কিংস কলেজের। ১৯৫১’র এক বিকেলে এক আউটসাইডার এসে সেই প্রেজেন্টেশান দেখে গেলেন। এই আউটসাইডারের নাম জেমস ওয়াটসন। হাঁ, কেমব্রিজের সেই ওয়াটসন যাকে আমরা ডিএনএ’র দু’জন আবিষ্কর্তার একজন হিসেবে জানি। ওয়াটসন কেম্ব্রিজে পৌঁছে ঝটপট একটা মডেল বানিয়ে ফেললেন।

দিকে দিকে সেই খবর বাতাসের মতোই ছড়িয়ে দিলেন---যে তারা ডিএনএ’র স্ট্রাকচার পেয়ে গেছেন। সেই খবর শুনে কিংস থেকে ফ্র্যাংকলিন ছুটে এলেন। ওয়াটসনের মডেল দেখে ফ্রাঙ্কলিন হেসেই উড়িয়ে দিলেন। ফ্র্যাঙ্কলিনের বস ওয়াটসনের বসের কাছে অভিযোগ করলেন, আপনার লোক তো আমাদের আনপাবলিশড কাজ নিয়ে মডেল দাঁড় করায়ে ফেলসে। এটা তো ঘোরতর অন্যায়। একজন বিজ্ঞানীর কাছে এটা তার বউয়ের সাথে পরকীয়া করার সমান অপরাধ।

ওয়াটসন-ক্রীকের বস ছিলেন স্যার লরেন্স ব্র্যাগ। ইনার নাম আমরা ছোটবেলায় কেমিস্ট্রি বইয়ে হালকাপাতলা শুনেছি। ওয়াটসন-ক্রীকের ল্যাব বন্ধ করে দেয়া হল। তাদের সমস্ত যন্ত্রপাতি পাঠিয়ে দেয়া হল কিংসে। ডিএনএ দৌড় থেকে ওয়াটসন আর ক্রীক অফিশিয়ালি আউট হয়ে গেলেন। আউট হলেও এরা দমে থাকলেন না। কিছুদিনের মধ্যে এক রসায়নবিদ এলেন কেম্ব্রিজে। তাকে গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে ওয়াটসন আর ক্রীক জেনে নিলেন, একটা ডিএনএ, তা সে যে প্রাণীরই হোক না কেন---এতে যতোগুলো A থাকবে, ততোগুলো T থাকবে। আবার যতোগুলো G থাকবে, ততোগুলো C-ও থাকবে। একজন কেমিস্টের কাছে একটা সামান্য তথ্য মাত্র। ওয়াটসন-ক্রীকের কাছে এটা একটা ভাইটাল ইনফরমেশন। এর একটাই মানে হতে, A আর T হয়তো সবসময় জোড়ায় জোড়ায় থাকে। আবার G আর Cও জোড়ায় জোড়ায় থাকে। তারা বুঝলেন, ডিএনএ রহস্য ভেদ করার প্রথম ক্লু-টি তারা পেয়ে গেছেন। এখন প্রশ্ন হল এই জোড়াগুলো নিজেদের মধ্যে কীভাবে বন্ধন তৈরি করে??

এর মধ্যে পাউলিং একটা ত্রিমাত্রিক মডেল দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন। যেটা ছিল সম্পূর্ণই ভুল। ডিএনএ’র কোন ধর্মই এই মডেল ব্যাখ্যা করতে পারছিল না। পাউলিং ছিলেন গড টাইপ। কেউ তার ভুল ধরিয়ে দিতে সাহসও করছিল না।

এদিকে কিংসে তখন অনেকদূর কাজ এগিয়েছে। ফটোগ্রাফিক প্লেটে পড়া ডটগুলো দিন দিন স্পষ্ট হয়ে আসছিল। ফ্র্যাঙ্কলিন এরকম দেখতে একটা এক্স প্যাটার্ণ পেলেন। দেখে বুঝলেন, ডিএনএর উপাদানগুলো তাহলে সর্পিলাকারে সজ্জিত। ফ্র্যাঙ্কলিন এর নাম দেন হেলিক্স। কিছুদিন পর ওয়াটসন কিংসে গেলেন লেটেস্ট আপডেট জানার জন্য। সেখানে উইল্কিন্স তাকে এই এক্স প্যাটার্ণওয়ালা ছবিটা দেখালেন। ক্রীকের এক্স-রে ফিজিক্স নিয়ে সামান্য পড়াশোনা ছিল। সেই পড়াশোনা এবার কাজে লাগলো। তিনি বুঝতে পারলেন, এই এক্স এর মধ্যে লুকিয়ে আছে দুটো হেলিক্স। আজকে যাকে আমরা ‘ডাবল হেলিক্স’ বলি। দুটো হেলিক্সকে যদি আমরা একটা আরেকটার উপর রাখি আর এদেরকে দূর থেকে দেখি, গোটা স্ট্রাকচারের একটা অংশ জুম করলে সেটাকে এক্স বলে বোধ হবে। ক্রীক এই ব্যাপারটা ধরতে পারলেন। পাজলের আরেকটা ধাপও জোড়া লেগে গেলো।

এতোদিন ওয়াটসন-ক্রীক অন্যের আবিষ্কার করা তথ্য নিয়ে কাজ করছিলেন। এবার তারা নিজেরা ফাইন্যালি একটা মডেল দাঁড় করালেন। ওয়াটসন দেখলেন, এই মডেলে A এর হাইড্রোজেন T এর নাইট্রোজেনের দিকে মুখ করে আছে। একই রকম ঘটনা ঘটছে C আর G এর মধ্যেও। সুতরাং, প্রায় একই রকম দেখতে দুটো জোড়া পাওয়া গেলো। এদের নাম দেয়া হল বেইস পেয়ার। এই পেয়ারগুলোর গঠন আবার একই রকম। কাজেই, একটাকে আরেকটার উপর খাপে খাপ বসানো যাচ্ছে। আর X আক্তির ইমেজ দেখে আগে থেকেই যেহেতু ডাবল হেলিক্সের আইডিয়া এদের মাথায় ছিল, তারা বেস পেয়ারগুলোর একটাকে আরেকটার উপর বসিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না। এদের মোচড় দিয়ে ঘুরিয়েও দিলেন। অনেকটা সর্পিলাকার সিঁড়ির মত। আর এভাবেই জন্ম নিল ইতিহাস বদলে দেয়া ডিএনএ ডাবল হেলিক্স স্ট্রাকচারের।

ওয়াটসন-ক্রীক শেষ পর্যন্ত দমটা ধরে রাখতে পেরেছিলেন। আর এটাই তাদের এই ডিএনএ দৌড়ে জিতিয়ে দিল।

লেখক: নাসরিন তসলিমা, একজন তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ