১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৫ম বর্ষ ৫২শ সংখ্যা: বার্লিন, শনিবার ২৪ডিসে –৩১ডিসে ২০১৬ # Weekly Ajker Bangla – 5th year 52st issue: Berlin, Saturday 24 Dec–31 Dec 2016

তবে কি বলবো- অসহিষ্ণুতা চিরজীবী হোক?

প্রসঙ্গ: বাংলা একাডেমি

প্রতিবেদকঃ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা তারিখঃ 2016-12-28   সময়ঃ 13:46:24 পাঠক সংখ্যাঃ 282

রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা সম্পর্কে আমরা জানি। এবার দেখছি বুদ্ধিবৃত্তিক অসহিষ্ণুতা। বাংলা একাডেমি প্রতিবছর যে অমর একুশে বইমেলার আয়োজন করে, তাকে আমরা বলি প্রাণের মেলা। এই মেলা বাঙালির ভাষাপ্রীতি, ভাষার জন্য সংগ্রাম ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক মানোন্নয়ন ও সচেতনতা তৈরিতে এই মেলার অনেক গুরুত্ব।
এই মেলার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে আমাদের জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির সম্মিলন। উদার, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বড় ক্ষেত্র একুশের বইমেলা। একুশের বইমেলা নিয়ে আমাদের গর্ব আছে, অহংকার আছে। যে আলোকিত মানুষ খুঁজি দেশের জন্য, এই মেলা তাদেরই মেলা।> সৌজন্যে বাংলা ট্রিবিউন
সেই বইমেলা এখন কোন পথে? বাংলা একাডেমি অমর একুশে বইমেলায় শ্রাবণ প্রকাশনীকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে। বইমেলা কমিটির সচিব জানিয়েছেন, ‘একাডেমির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা’ করায় ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমি বইমেলা কমিটির সচিব জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত বইমেলায় বাংলা একাডেমি পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘ইসলাম বিতর্ক’ নামে একটি বই নিষিদ্ধ করেছিল। আর একাডেমির সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন শ্রাবণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রবিন আহসান; যা বাংলা একাডেমির বইমেলার স্বার্থের পরিপন্থী।

 

কোনও একটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলেই তা বইমেলার স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে যায়? একাডেমির মহাপরিচালক কিংবা সদস্য সচিব যদি একটু ব্যাখ্যা করতেন কী সেই স্বার্থ? সত্যি বলতে কী, যুক্তির কাছে হেরে মৌলবাদীরা যেমন কতলের পথ বেছে নেয়, এখানেও সেই নজির স্থাপন করলো বাংলা একাডেমি।

গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে প্রতিবাদ করার অধিকার আছে নাগরিকের। বাংলা একাডেমি কি বলতে পারবে যে রবিন আহসান দেশ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত?

বাংলা একাডেমি ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। তাহলে এটাই আমাদের গণতান্ত্রিক মানসিকতা? যে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যে প্রকাশনীকে বইমেলা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার পক্ষে বাংলা একাডেমির যুক্তি থাকতে পারে এবং হয়তো আছেও। সেটা তুলে ধরাই তার কাজ। যে বা যারা প্রতিবাদ করছে বা করবে, তাদের কাছে সেই যুক্তি পৌঁছে দিতে পারে একাডেমি। কিন্তু সাহিত্য সংস্কৃতির পবিত্র জায়গা থেকে এমন সিদ্ধান্ত আমাদের জানিয়ে দিল বাংলা একাডেমি ভিন্ন স্বরের অস্তিত্বকে আর স্বীকার করে না।

একাডেমির প্রধান হয়তো বলবেন যে, কাউন্সিলরদের সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিঃসন্দেহে শ্রাবণ প্রকাশনীকে সরিয়ে রাখার ছাড়পত্র। কিন্তু মেলার দর্শন অর্থাৎ উদারতা আর সমালোচনা সইবার যে শক্তি থাকা দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তার কোনও প্রাসঙ্গিকতা থাকবে না?  

বাংলাদেশের সমাজে আমরা যারা থাকি তাদের কাছে অসহিষ্ণুতা অচেনা নয়। অসহিষ্ণুতার জবাবটাও যে  অসহিষ্ণু হয় তাও জানা। তাই অসহিষ্ণুতার বদলে অসন্তোষের কোনও সোপান তৈরি করছি কিনা, মহাপরিচালক বা একাডেমির সদস্যরা কি ভাববেন একবার? নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের মতো একাডেমিও প্রমাণ করতে চায় যে, কাজের ধরন যা-ই হোক, ক্ষমতাবান মানেই সতত অসহিষ্ণু। অসহিষ্ণুতাই রাজনীতির মূলমন্ত্র জানতাম, এখন দেখছি সাহিত্য চর্চায়ও।

ইডিওলজিক্যাল ইনটলারেন্টরা আসলে প্রকারান্তরে ইডিওলজিক্যাল ইডিয়টস হয়। বিভিন্ন ইডিওলজি বা মতাদর্শ (মানবতা-বিরোধী অবশ্যই নয়) প্রকাশ করার অধিকারের কথা আমরা বলি, কিন্তু তা মানি না। একাডেমি কাউন্সিলরদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাভুটির কথা বলছে। কিন্তু এর মাধ্যমে আবার এও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, তার কার্যক্রম সম্পর্কে স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার লেখক, প্রকাশক কারোই নেই।

সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, পরধর্ম অসহিষ্ণু মতবাদের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, মানবতাবাদী মানুষের লড়াই সবসময়ই বন্ধুর পথ ধরে এগিয়ে চলে। রাজনৈতিক ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের দিক থেকে চাপ আসলে তার মোকাবেলায় মানুষের বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের কাছে আশ্রয় চায়। কিন্তু সেই মোকামও এখন অনেক অসহিষ্ণু।  

বাংলা একাডেমি অন্ধকারের শক্তির ভয়ে আলোর পথের দিশারীকে নিষিদ্ধ করেছে। এরকমটা আগেও করেছে। হঠাৎ করে মেলা থেকে বই প্রত্যাহার, প্রকাশনীর স্টল বন্ধের অনেক ঘটনা বিভিন্ন সময় দেখা গেছে। যাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এসব করা হচ্ছে তারা কেবল শক্তি সঞ্চয় করছে। আর যাদের সাথে নিয়ে এই অপশক্তিকে মোকাবেলা করা দরকার, এখন তাদেরই নিষিদ্ধ করে দেওয়া।

আজ একটি প্রকাশনীকে করা হয়েছে। সফল হলে আগামীতে নিশ্চয়ই আরও অনেককেই করা হবে। সরকারের অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে পাশের দেশ ভারতে আমরা দলে দলে শিল্পী সাহিত্যিকদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার হিড়িক দেখেছি কিছুদিন আগে। যদি আমাদের সাহিত্যিকরাও বাংলা একাডেমির পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়া শুরু করেন? ভাবতে পারছে কি একাডেমি? সেই পর্যায়ে যাক বিষয়টি সেটা কারো কাম্য নয়। আরেকবার বিবেচনা করুক একাডেমি সেটাই চাই। 

অসহিষ্ণু শ্রেণির কোপে হারিয়ে গেলেন কত লেখক, প্রকাশক, পুরোহিত, জ্ঞানের জগতের মানুষ। এবার একাডেমি কোপ দিল প্রকাশককে। একাডেমির তো সামাজিক ভূমিকা রয়েছে। তাদের দ্বারা লেখক আর প্রকাশকে একঘরে করার এমন প্রচেষ্টা দুঃখজনক। সময়টা এমনিতেই ভালো নয়, স্বস্তির নয়। বাতাসে মিশে গিয়েছে সহিংসতার বাষ্প এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে দেশের সর্বত্র। সেখানে সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের এহেন অসহিষ্ণু দৃষ্টান্ত সুখকর নয় কারও জন্যই।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৭ তে বিতরণকরা নতুন বইয়ে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা ১৭ টি প্রবন্ধ বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামী মৌলবাদী লেখা যোগ হয়েছে, আপনি কি এই পুস্তক আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুমোদন করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ