২০ নভেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ০২য় সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ০৮ জানু –১৪ জানু ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 02nd issue: Berlin, Sunday 08 Jan–14 Jan 2017

শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এসব কী?

শিক্ষাব্যবস্থায় স্বাধীনতা বিরোধী দের নগ্ন হস্তক্ষেপ: সামাজিক বিক্ষোভ

প্রতিবেদকঃ নাজমুল হাসান তারিখঃ 2017-01-08   সময়ঃ 05:23:50 পাঠক সংখ্যাঃ 190

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ন্যাশনাল কারিকুলাম এন্ড টেক্সট বুক বোর্ড কর্তৃক প্রণীত পুস্তকের মোড়কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছবির নিচেয় ভুল ইংরেজিতে লেখা বাক্য ও তৈলবাজিমূলক বাংলা সায়র দেখে প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না, ছবিটা সত্য কিনা! স্বভাবতই এমন একটি বিষয় কোন সচেতন মানুষের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য হবার কথা নয়। ছবিটা দেখার সাথে সাথে ন্যাশনাল কারিকুলাম এন্ড টেক্সট বুক বোর্ড (NCTB) এ কথা বললাম। কথা বলে জানলাম ঘটনা সত্য। খুব ব্যথিত হলাম।

ইংরেজি বাক্যটি লেখা হয়েছে- DO NOT HEART ANYBODY. বানানটি heart নাকি hurt হবে সে বিষয়টি NCTB আমাকে পরিষ্কার করতে পারেনি। আমার স্বল্প শিক্ষায় আমি যেটা বুঝি তাতে বানানটা hurt হবে। NCTB মূলত বই ছাপা ও বিতরণের কাজ করে বলে জানি। এটি বোধ হয় তাদের দায়িত্ব নয়। আসলে ভুলের দায়িত্ব কেউ নেয় না। এখন এটি বোধ হয় কারও দায়িত্বের মধ্যেই পড়বে না। কারও কিছু হবেও না। অথচ এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ, যাকে ভুল বললে কম বলা হয়।

বাংলা স্লোগানটিতে লেখা হয়েছে- “শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ”। স্লোগানটি খুব মানসম্মত স্লোগান হয়নি। “শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ” না লিখে “সুশিক্ষায় গড়ব দেশ” লিখলে হয়ত আরও ভাল হতো। যাক সে কথা, আমার আলোচনার বিষয় পরের চরণ নিয়ে। আমি “শেখ হাসিনার বাংলাদেশ” এ অংশটুকু নিয়ে কথা বলতে চাই। একজন নিখোঁজ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক এবং এক্টিভিস্ট হিসেবে আমি বিশ্বাস করি- বাংলাদেশ হল মুক্তিযুদ্ধের, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ বললেও তা গ্রহণযোগ্য হয়। ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’ কথাটা খুব যুতসই বলে মনে হয় না। আমার ধারণা, এ কথাটি লিখে এখানে ব্যাপক তেলবাজি করা হয়েছে যা শেখ হাসিনার মতো মহান নেত্রীকে নেতিবাচক অবস্থায় নামিয়ে আনার মতো বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এমন তৈলবাজি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্যও বিব্রতকর হওয়ার কথা।

সংবিধান ও প্রথা অনুযায়ী দেশের শাসনভার পরিবর্তন হবে, দেশে নতুন নির্বাহী দায়িত্বে আসবে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু অপরিবর্তিতই থেকে যাবে। বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ এ তিনটি বিষয় অবিচ্ছেদ্য। বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য শেখ হাসিনার অবদান অতুলনীয়। কিন্তু সে বিষয়টিকে এভাবে টেক্সট বুকে তুলে ধরার বিষয়টি আমার কাছে প্রশ্নসাপেক্ষ বলে প্রতীয়মান হয়েছে। হতে পারে তা আমার ভুল। আমার মনে হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অবদানকে তুলে ধরার জন্য সরকারের বহু ডেভলপমেন্টাল প্রজেক্ট আছে, বহু সরকারী প্রকাশনা আছে, সেখানে এটি মানানসই ও যুক্তিযুক্ত।

দেশ ও জাতি সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় যাদের অবদান গাঁটছড়া দেশ যদি তাদের নামে হয়, সেটা বেশি মানানসই হয়। দেশের নির্বাহীর নামে এটা কতটা মানানসই সেটা ভেবে দেখার দরকার আছে বৈকি। যখন যিনি নির্বাহী থাকবেন তখন তার নামে টেক্সট বুকে এ স্লোগান ছাপতে হলে এই একটা স্লোগানের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ হবে। আরেকজন নির্বাহী এলে তখন তার নামে এ শ্লোগান ছাপানোর প্রক্রিয়া হয়তবা এখন থেকে শুরু হল। তাছাড়া এটি টেক্সট বুক, কোন দলীয় ডকুমেন্ট নয়, ইচ্ছেমত এখানে সবকিছু করা যায় কিনা তাও বিবেচনায় রাখার দরকার আছে।

দেশ সবার, দেশটাকে যারা সবার করতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে অর্থাৎ দেশের স্বাধীনতা এনেছে তাদেরকে কৃতিত্ব দিয়ে জাতীয় স্লোগান বানানোই কাঙ্ক্ষিত এবং যুক্তিযুক্ত। সে অর্থে এ স্লোগানটি যদি হয় মুক্তিযুদ্ধ বা বঙ্গবন্ধুর নামে তবে তা মানুষের কাছে আরও হৃদয়গ্রাহী হয়। সেটি স্থায়ীও বটে। তাতে শেখ হাসিনা ছোট হন না বরং আরও শ্রদ্ধার স্থানে অধিষ্ঠিত হন। বঙ্গবন্ধু বড় হলে বাংলাদেশ বড় হয়, শেখ হাসিনাও বড় হন, বড় হয় প্রতিটি বাঙালি। “সুশিক্ষায় গড়ব দেশ, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ” স্লোগানটি আমার কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।

এমন ভুল ও তেলবাজি প্রতিনিয়তই দেখা যাচ্ছে। সচেতন মহলের কাছে প্রশ্ন জাগছে- চারিদিকে কী হচ্ছে এসব? অতিরিক্ত তেলবাজি এবং ভুল মানুষের ভুল যায়গায় থেকে ভুলের রাজ্য বিনির্মাণের প্রতিযোগিতা দেখে এ দেশে জন্মানোটা গর্বের চেয়ে লজ্জার হয়ে উঠছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। এটি যারা ভাবছেন তারা দেশকে ভালবাসেন বলেই ভাবছেন। লজ্জিত হওয়ার মতো বিষয়ে তারা লজ্জিত হচ্ছেন। তাদের এ সুস্থ অনুভূতিকে আমলে নেওয়ার দরকার আছে।

দুই.
পাকিস্তান আমলে কাজী নজরুল ইসলামের 'মহাশ্মশান' কবিতার 'মহাশ্মশান' শব্দটি বদলে দিয়ে তার পরিবর্তে 'গোরস্থান' শব্দটি বসানো হয়েছিল। ধর্মীয় গোঁড়ামো বিবেচনায় নিয়ে সাহিত্যের উপরে চালানো অমার্জিত সে অপরাধের খড়গ স্বাধীন বাংলাদেশেও অব্যাহত। এখন বোধকরি তা আরও বেড়েছে। অদ্ভুত অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে হিন্দু ও মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা টেক্সট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে । ইসলামি মৌলবাদের কাছে নতি স্বীকার করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি-
১. পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বই থেকে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হুমায়ূন আজাদের 'বই' কবিতাটি বাদ দেওয়া হয়েছে। যে কারণে বাদ দিয়েছে তা হল - 'যে বই তোমায় ভয় দেখায়/ সেগুলো কোন বই নয়/সে বই তুমি পড়বে না/যে বই তোমায় অন্ধকারে বিপথে নেয়'! হুমায়ূন আজাদ এখানে কোন বইয়ের নাম উল্লেখ করেনি; অথচ মুসলমানরা ধরে নিয়েছে কুরআন শরিফকেই নাকি ইঙ্গিত করা হয়েছে, এতে কোমলমতি শিশুদের ইসলাম বিদ্বেষী করা হচ্ছে। এর পরিবর্তে সংযুক্ত হয়েছে 'বিদায় হজ'।

২. ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইতে এস ওয়াজেদ আলীর 'রাঁচি ভ্রমণ' বাদ দেওয়ার কারণ, এখানে ভারতের ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচি'র কথা বলা হয়েছে যা হিন্দুদের একটি তীর্থস্থান। পরিবর্তে সৈয়দ মুজতবা আলীর 'নীলনদ আর পিরামিডের দেশ' যুক্ত হয়েছে।

৩. ষষ্ঠ শ্রেণির সত্যেন সেনের 'লাল গরুটা' বাদ দেওয়ার কারণ, গরু মায়ের মতো উল্লেখ করে মুসলমান বাচ্চাদের নাকি হিন্দুত্ববাদ শেখানো হচ্ছে। এর পরিবর্তে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ রচিত 'সততার পুরষ্কার' যুক্ত করা হয়েছে। এটি পুরোটাই ইসলামিক ধ্যান ধারণা নিয়ে রচিত।

৪. সপ্তম শ্রেণির বাংলা বইতে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের 'লাল ঘোড়া' গল্পটি বাদ দেওয়ার কারণ, গল্পের লালু নামের ঘোড়া। গল্পটিতে পশুর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে; এতে নাকি মুসলমানদের পশু কোরবানিতে বাঁধা দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। যার পরিবর্তে হাবীবুল্লাহ বাহারের 'মরু ভাস্কর্য' যুক্ত হয়েছে। যেখানে প্রকাশ পেয়েছে নবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর জীবন চরিত।

৫. সুকুমার রায়ের 'আনন্দ' কবিতায় ফুলকে ভালোবাসার কথা বলেছে যেটা ইসলামের সাথে মেলে না - তাই বাদ পড়ে গেছে। কবি হিন্দু এটা হয়তবা মূল কারণ।

৬. কালিদাস রায়ের 'অপূর্ব প্রতিশোধ' কবিতায় কত সুন্দরভাবে ইসলামের প্রশংসা করা হয়েছে- 'তার তাজা খুলে ওজু করে আজো নামাজ পড়িনি/আত্মা তোমার ঘুরিছে ধরায় স্বর্গে পাইনি ঠাঁই! তবুও কবিতাটি বাদ দেওয়া হয়েছে। হয়ত কবি হিন্দু বলে।

৭. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'মে দিনের কবিতা' কেন বাদ দেওয়া হয়েছে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। কবি হিন্দু এটিই হয়ত কারণ।

৮. স্বর্ণকুমারী দেবীর 'উপদেশ' কবিতাতে পিতামাতা এবং গুরুজনকে দেবতুল্য বলা হয়েছে। জগতের সৃষ্টিকর্তা ভগবান, এ কারণে কবিতাটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

৯. রণেশ দাশগুপ্তের 'মাল্যদান' গল্পে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে; অথচ এটাকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ, লেখক হিন্দু।

১০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'বাংলাদেশের হৃদয়' কবিতাটি বাদ দেওয়ার কারণ- 'ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে, বাঁ হাত করে স্নেহের হাসি' কথাগুলির মাধ্যমে নাকি দেবী দুর্গাকে প্রশংসা করা হয়েছে।

১১. শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গল্প 'লালু' বাদ দেওয়ার কারণ ওখানে কালীপূজা ও পাঁঠা বলির কাহিনীর বর্ণনা আছে।

১২. অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইতে বুদ্ধদেব বসুর 'নদীর স্বপ্ন' কবিতাটি বাদ দিয়ে কায়কোবাদের 'প্রার্থনা' যুক্ত করেছে। এখানেও কবি হিন্দু।

১৩. উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী রচিত 'রামায়ণ কাহিনী-আদিখণ্ড' শীর্ষক গল্পটি বাদ দিয়েছে ; কারণ সেখানে রামকে প্রশংসিত করা হয়েছে যেটা নাকি কোমলমতি মুসলমান শিশুদের আঘাত করবে।

১৪. নবম শ্রেণির বাংলা বই থেকে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পালামৌ' গল্পটি বাদ দেওয়ার কারণ, এটি ভারতের পর্যটন স্পট।

১৫. জ্ঞান দাস রচিত 'সুখের লাগিয়া' কবিতাটি বাদ দেওয়ার কারণ, কবিতাটিতে রামকৃষ্ণের প্রতি ভক্তি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে । পরিবর্তে শাহ মোহাম্মদ সগীরের 'বন্দনা' যুক্ত হয়েছে। এটা ইসলামিক চিন্তাধারার কবিতা।

১৬. ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর রচিত 'আমার সন্তান' কবিতাটি বাদ দেওয়ার কারণ, কবিতায় মঙ্গলকাব্যের অন্তর্ভুক্তি, যেখানে দেবী অন্নপূর্ণাকে প্রশংসা ও প্রার্থনা করার কথা বলা হয়েছে। এর পরিবর্তে আলাওলের 'হামদ' কবিতাটি যুক্ত করেছে।

১৭. লালন শাহ রচিত 'সময় গেলে সাধন হবে না' কবিতাটি বাদ দেওয়ার কারণ, লালন সমাজকে প্রশংসিত করেছে, আসলে সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'লার। পরিবর্তে আব্দুল হাকিমের 'বঙ্গবাণী' কবিতাটি যুক্ত করেছে ।

১৮. রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'স্বাধীনতা' কবিতাটি কি কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে তা জানা যায়নি। যার পরিবর্তে গোলাম মোস্তফার 'জীবন বিনিময়' কবিতা যুক্ত করেছে। কবি হিন্দু সেটিই হয়ত কারণ।

১৯. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সাঁকোটা দুলছে' কবিতাটি বাদ দেওয়ার কারণ, ওখানে সাতচল্লিশের দেশভাগকে নাকি হেয় করা হয়েছে। যার পরিবর্তে কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামিক কবিতা 'উমর ফারুক' যুক্ত করেছে।

এ পরিবর্তনগুলির ফলে সাহিত্যের মান বাড়েনি বরং সার্বজনীনতা রুদ্ধ হয়েছে বলে অনেকেই মতামত ব্যক্ত করছেন। এ সকল পরিবর্তনের ফলে শিশুরা কাঙ্ক্ষিত কম্পিটেনসিগুলি অর্জন করতে ব্যর্থ হবে বলে সকলে মনে করছেন। কম্পিটেনসিগুলি অর্জনের পরিবর্তে শিশুরা নির্দিষ্ট ধর্মকেন্দ্রীক শিক্ষা লাভ করবে। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় থেকে এ কাজগুলি সজ্ঞানে করেছে নাকি অজ্ঞাতে করেছে জানি না। এমন অসংলগ্ন পরিবর্তন দেখে মনে হচ্ছে আমরা মধ্যযুগে ফিরে যাচ্ছি, সে যুগের প্রেত হাতছানি দিয়ে আমাদের ডাকছে! অনেকেই হাস্যরস করে বলছেন, আমাদের দেশে আর মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়াবার দরকার নাই, কারণ স্কুলগুলিকেই মাদ্রাসায় পরিণত করা হচ্ছে। এখন স্কুলগুলিকে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে দিয়ে দিলেই হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে হাটহাজারিতে নিয়ে যাবার কথাও কেউ কেউ বলছেন।

(সূত্র: মনোয়ার মনা'র ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে সংগৃহীত এবং পরিবর্তিত। তিনি এটি নয়ন সাহা ও স্বপ্না রাণী'র সৌজন্যে পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন।)

তিন.

সংযুক্ত ছবিগুলি দেখলে কি মনে হয় এগুলি বাচ্চাদের উপযুক্ত কোন বই? ভয়াবহ নিম্নমানের সায়র দিয়ে লেখা হয়েছে বইগুলি। প্রান্তমিল ঠিক রাখার চেষ্টা করলেও এখানে অন্তমিল বলে কিছু নাই। কোন মাত্রা ঠিক নাই। এ বইটি যারা প্রকাশ করেছে তাদের বাংলাভাষার ছন্দ সম্পর্কে কোন ধারণাই নাই। শুধুমাত্র কতগুলি সস্তা কথা-বার্তা প্রচারের উদ্দেশ্যে এ বইটি প্রকাশ করা হয়েছে তাতে কোন সন্দেহই নাই। তাছাড়া কোনোভাবেই কি বোঝার উপায় আছে এটি মাদ্রাসার বই নাকি স্কুলের বই? এটা কি কোন ধর্ম বই? আমার জানামতে যে কোনও ধরনের নোটবইই বাজারে নিষিদ্ধ, তাহলে এসব বইয়ে কেন বাজার সয়লাব? এসব দেখার কি কেউ নেই?
(ছবি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।)

চার
সদ্য প্রকাশিত টেক্সট বুকগুলিতে ইসলামিকরণ প্রচেষ্টার পাশাপাশি প্রচুর ভুলের ছড়াছড়ি লক্ষ করা গেছে। এ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হচ্ছে, টক-শোগুলিতে আলোচনা হচ্ছে, ফলে আমি এখানে তেমন কিছু বলতে চাচ্ছি না। ফেসবুকাররা দেশে বেশকিছু ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। এই ভুলগুলি ধরে তা প্রচার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারাও আরেকটি বড় অবদান বলে মনে করি। বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান ফেসবুকারদের মূর্খ বলে তিনি তার নিজের মূর্খতাকেই প্রচার করেছেন বলে মনে হয়।

টেক্সট বুকের ভুলগুলি নিয়ে নানান ধরনের স্যাটায়ার চলছে, আবার এমনকিছু সত্য ঘটনা ঘটেছে যা স্যাটায়ারকেও হার মানায়। এরকম একটা স্যাটায়ার এবং একটা সত্য ঘটনা বলে শেষ করব। প্রথম শ্রেণির টেক্সট বুকে লেখা হয়েছে- ও-তে ওড়না চাই। এটা নিয়ে স্যাটায়ার বলছে- ছেলে শিশুদের তো ওড়নার দরকার নাই, তারা ওড়না দিয়ে কি করবে! সুতরাং এটাকে সকল শিশুদের উপযোগী করতে হলে লিখতে হবে- ও-তে ওড়না চাই। (মেয়ে শিশু) এবং ও-তে ওড়না ধরে টানতে চাই (ছেলে শিশু)।

প্রথম শ্রেণির 'বাংলা পাঠ' বইয়ের ১১ পৃষ্ঠায় 'অ' বর্ণটি চেনাতে 'ছাগলে আম খায়' লেখা হয়েছে। ছাগল গাছ থেকে আম বা আমপাতা খাচ্ছে তেমন ছবিও দেওয়া হয়েছে। বলে রাখা ভাল যে, 'অজ' মানে ছাগল। এ শব্দটি খুবই অপরিচিত এবং বিলুপ্তও বটে। এমন শব্দের ব্যবহার অপ্রত্যাশিত। তাছাড়া ছাগলের আম খাওয়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক। ছাগল আমপাতা খেলেও তা গাছ থেকে খায় সেটিও অস্বাভাবিক। আমগাছ বড় বৃক্ষ, চারাগাছ ছাড়া ছাগলের পক্ষে আমপাতা খাওয়া সম্ভব নয়। চারা আমগাছ থেকে ছাগলের আমপাতা খাবার দৃশ্যও স্বাভাবিক কোন দৃশ্য নয়। কেন এমন একটি অসংলগ্ন বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে বইটির সংকলন, রচনা ও সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা জনাব হায়াৎ মামুদ বলেন-কথায় বলে না, ছাগলে কি না খায়! সুতরাং ছাগলে আমও খায়, সে জন্য দেওয়া হয়েছে। এতে কোন ভুল হয়নি। এটি শুনে অনেকেই কৌতুক করে বলছেন- ছাগলে সবই খায় তো এই জ্ঞানীগুলিরে খায় না কেন?

পরিশিষ্ট: একটা জাতিকে দীর্ঘ মেয়াদে নিঃশেষ করার জন্য সে জাতির বুদ্ধিজীবী ও শিশুদেরকে টার্গেট করা হয়। এদেশের পাকিস্তানপন্থী একটা গোষ্ঠী ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ আমাদের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যার মাধ্যমে তাদের প্রথম টার্গেট সাফল্যজনকভাবে শেষ করেছে এখন এ সমস্ত আলতু-ফালতু বই প্রকাশ করে শেষ করা হচ্ছে আমাদের শিশুদের, যারা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। পাকিস্তানপন্থীরা বসে নেই, নানান লেবাসে তারা বাংলাদেশকে বাংলাস্তান বানানোর জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের মধ্যেই তারা আছে।

আমি নিশ্চিত পাকিস্তান আমলে বাংলাভাষা নিয়ে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটলে ভাষা আন্দোলনের মতো তীব্র আন্দোলন হতো, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে চরম আন্দোলনের মুখে তাদের পড়ে যেতে হতো। কিন্তু এখন কেন যেন সব চুপচাপ! সব দেখে মনে হচ্ছে আমরা এখন ধর্ষিত হয়েও সে ধর্ষণ উপভোগ করছি!

আমরা জানি না প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান ফিজার এবং সচিব মোহাম্মদ আসিফ-উজ-জামান; নুরুল ইসলাম নাহিদ, মন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সোহরাব হোসাইন, সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ; মো. আলমগীর, ভারপ্রাপ্ত সচিব, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং নারায়ন চন্দ্র সাহা, চেয়ারম্যান, এনসিটিবিএর দায় নিয়ে পদত্যাগ করে উৎকৃষ্ট কোন উদাহরণ সৃষ্টি করবেন কিনা? রাষ্ট্র কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে কিনা সেটিও জানি না। তবে নেওয়া উচিৎ বলে মনে করি।

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম না বাঁচলে দেশও বাঁচবে না। মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের নখর প্রবেশ করছে জাতির তৃণমূলে, আমাদের প্রতিরোধ করতেই হবে।

শেখ মো. নাজমুল হাসান, চিকিৎসক, লেখক।



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ