২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ২৮শ সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ০৯জুল – ১৫জুল ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 28th issue: Berlin,Sunday 09Jul– 15Jul 2017

সেদিনের সেই দস্যি মেয়েটি বৌ হয়েছে বটে

স্মৃতিচারণ

প্রতিবেদকঃ জেসমিন চৌধুরী তারিখঃ 2017-07-13   সময়ঃ 03:55:51 পাঠক সংখ্যাঃ 2840

আঠারো বছর বয়সে যেদিন প্রায় অপরিচিত একটা লোকের সাথে বিয়ে হয়ে আমাদের টিলাবাড়ির মুক্ত বাতাস ছেড়ে একটা ছোট্ট গ্রামের বাঁশঝাড় ঢাকা পিচ্ছিল পথ ধরে ঘেঁষাঘেঁষি করে গড়ে উঠা কয়েকটা ঘরের একটায় গিয়ে বধূবেশে উঠেছিলাম, সেদিন আমার অস্তিত্বের একটা অংশের মৃত্যু ঘটেছিল।

আমার প্রথম স্বামীর বড়বোনের চমৎকার গানের গলা ছিল। আমার মনে হত ঠিকমত সুযোগ পেলে তিনি শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক মানের গায়িকা হতে পারতেন। যে বাড়িতে এরকম একটা প্রতিভা প্রস্ফুটিত হতে পারেনি সে বাড়িতে আমার কী অবস্থা হয়েছিল তা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয়।

সেই প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন চিপাচিপি বাড়িতে এই বোনটির অসম্ভব সুরেলা কণ্ঠে যখন তখন গান গেয়ে উঠা আমাকে ভীষণ আনন্দ দিত। যে মানুষটা এমন চমৎকার সুরের মুর্ছনায় এক সদ্য বিবাহিত কিশোরীর বেদনাক্লিষ্ট মনে আনন্দ এনে দিতে পারত, সেই মানুষটাই অন্যসময় পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মুখপাত্রী হয়ে তার জীবনকে অতীষ্ট করে তুলত। আমার কষ্ট লাগলেও কখনোই রাগ হতো না। এই ছোট গন্ডির বাইরের খবর রাখতেন না বেচারি, এর বেশি কিছু শিখবেন কী করে?

আব্বার অনুরোধে বিয়ের দিন প্রায় শুকনা চোখেই বিদায় নিয়েছিলাম কিন্তু পরদিন সকালে আমাদের বাড়ির কাজের ছেলে মুসলিম যখন নাশতা নিয়ে এল আর মাবাবার পাঠানো সেই নাশতা খেতে খেতে আমি চোখের পানি আটকে রাখার চেষ্টায় প্রায় সফল হতে চলেছি, তখনই আপা অসম্ভব সুন্দর অথচ করুণ সুরে গেয়ে উঠলেন,
'তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদের নাম
সে এখন ঘোমটা পরা কাজল বধূ দূরের কোন গাঁয়
যেদিন গেছে সেদিন কি আর ফিরিয়ে আনা যায়?'

আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলাম না, কিন্তু নতুন পরিবারের এই অচেনা মুখগুলোর সামনে নিজের একান্ত কষ্ট প্রকাশ করতে না চাওয়ার প্রচন্ড জেদে কাঁদতেও পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত নিজের কামরায় ছুটে গেলাম। পেছন পেছন ছুটে এলো মুসলিমও। মুসলিমের গলা জড়িয়ে ধরে এই প্রথম বাঁধভাঙ্গা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। ভুলে গেলাম মুসলিম একটা পরপুরুষ, আমার থেকে মাত্র দুই বছরের বড় এই ছেলেটাকে স্পর্শ করাও আমার জন্য অপরাধ, তাও আবার শ্বশুর বাড়িতে, তাও আবার বিয়ের পরদিন।

কিছুক্ষণ পর মুসলিম চলে গেলে আমার অনুভূতির অসহায়ত্বের কোন সীমা পরিসীমা থাকলো না। বাড়িতে আব্বার দমবন্ধ করা কড়া শাসনে বড় হয়েছি, সবসময় ভেবেছি বিয়ে হয়তো জীবনে মুক্তির আনন্দ এনে দেবে।

তখন আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল একটা লেখার ডায়েরী আর কলম। আমার কামরার একটি মাত্র জানালা খুলত ইটের দেয়াল ঘেঁষা একটা সরু পায়ে হাঁটা পথের উপর যার ঠিক ওপাশেই আরেকটা বাড়ি। সারি সারি সুপারী এবং আরো নানান জাতের গাছের ঠাসবুনানি পাতার ফাঁক দিয়ে ছোট ছোট টুকরা আকাশ দেখা যেত। পুরো আকাশটা কখনোই দেখতে পেতাম না, কারণ নজর আর যাদুটোনার ভয়ে ঘরের সামনের এক চিলতে উঠোনেও আমার বের হওয়া বারণ ছিল। আমি আবার সেই যুগে 'টুকটুকে সুন্দরী' ছিলাম কি না, তাই।

বিয়ের আগে আব্বার শাসন থেকে পালিয়ে থাকার জন্য অন্তত বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে পারতাম। প্রজাপতির পেছনে ছুটতাম, ফল পাকুড় পেড়ে খেতাম। কী অসাধারণ মুক্তি ছিল সেই টিলাবাড়ির আকাশে বাতাসে তা এই প্রথম বুঝতে পারলাম। আকাশ বাতাস প্রজাপতি আর বনবাদাড়ের অভাব যতটা কষ্ট দিতে লাগল, ততটাই আব্বার শাসনের অভাবও। এই বাড়ির চিপাগলি পরিবেশ আর ধ্যান ধারণা থেকে আব্বার শাসনের মধ্যেও অনেক বেশি উদারতা ছিল, মুক্তি ছিল। যে আব্বা বিয়ে দিয়ে এই বাড়িতে পাঠালেন, তার জন্যও ভীষণ মন কাঁদতে লাগল। বিয়ে নামক বিষয়টা যারা আবিষ্কার করেছে তাদেরকে অভিশাপ দিতে লাগলাম। এর নাম বিয়ে, মুক্তি, সুখ? এর নাম জীবন?

সেদিন একটা ছেলেমানুষী ছড়া লিখেছিলাম যা পরে হারিয়ে গেছে। লাইনগুলোও ঠিক মনে নেই। বিষয়টা ছিল এরকম- আমার খেলার সাথী আকাশ বাতাস ফুল পাখীরা আমাকে খুঁজছে, তারা বুঝতে পারছে না দুষ্টু মেয়েটা হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল। নানান ভাষায় আর ভঙ্গিতে তারা আমাকে ডাকছে, সাড়া না পেয়ে ব্যথিত হচ্ছে। শেষ দুই লাইনে দেয়া আমার জবাবটা এখনো মনে আছে,
'বলার আগেই চতুর্দিকে খবর গেল রটে
সেদিনের সেই দস্যি মেয়েটি বৌ হয়েছে বটে।'

জীবনের লাগাম শেষ পর্যন্ত টেনে ধরতে পেরেছি। আকাশ বাতাস ফুল পাখির মুক্তির কাছে ফিরে যেতে পেরেছি। কিন্তু তবু এসব কথা মনে পড়ে প্রায়ই চোখ ভিজে যায়। অল্পবয়সের সেই অসামান্য জেদ আর শক্তি এখন নেই। পরিচিত, অপরিচিত সবাইকে গল্পগুলো বলতে ইচ্ছে হয় যেগুলো আসলে একটা উপন্যাসের পরিধির দাবী রাখে। সবশেষে অনেক প্রাপ্তিতে জীবন ভরে উঠলেও 'যেদিন গেছে সেদিন কি আর' আসলেই 'ফিরিয়ে আনা যায়?'

লেখক জেসমিন চৌধুরী সোশ্যাল মিডিয়াতে অতি পরিচিত এক ব্যক্তিত্ব,  বেশ কয়েক বছর থেকেই গল্প কবিতা লেখেন  সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর বই - নিষিদ্ধ দিনলিপি - সংগ্রামী নারীদের প্রেরণাস্থল - এই বইটিতে বিভিন্ন বিষয়ের উপর ৪০টি ভিন্নধর্মী লেখা আছে। 

 

 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

বাংলাদেশের প্রাইমারি ও মাধ্যমিক শিক্ষা পাঠক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে জানুয়ারি ২০১৭ তে বিতরণকরা নতুন বইয়ে অদ্ভুত সব কারণ দেখিয়ে মুক্ত-চর্চার লেখকদের লেখা ১৭ টি প্রবন্ধ বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামী মৌলবাদী লেখা যোগ হয়েছে, আপনি কি এই পুস্তক আপনার ছেলে-মেয়েদের জন্য অনুমোদন করেন?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ