১৮ নভেম্বর ২০১৭ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৬ষ্ঠ বর্ষ ৩৫শ সংখ্যা: বার্লিন, রবিবার ২৭আস্ট – ০২সেপ্টে ২০১৭ # Weekly Ajker Bangla – 6th year 35th issue: Berlin,Sunday 27Aug – 02Sep 2017

মাধবীলতার ডাইরি, 'বার্লিনের পথে'

ছোটগল্প

প্রতিবেদকঃ রাশা মহিউদ্দীন তারিখঃ 2017-08-27   সময়ঃ 17:52:29 পাঠক সংখ্যাঃ 101

মাধবীলতার ডাইরি সমরেশ মজুমদার এর লেখা কালবেলা উপন্যাস এর ছায়া থেকে কল্পিত অনিমেষ, আর মাধবীলতা চরিত্র দুটো নেওয়া হয়েছে।

সেই কলেজে পড়ার সময় মেয়েটার মাথায় সমরেশ মজুমদার এর 'কালবেলা' বইটা ঢুকে গিয়েছিল। মফস্বলে বড় হওয়া মেয়েটা নিজেকে মাধবীলতার মত ভাবতে ভালবাসত। সেই থেকে ছাত্রজীবনে রাজনীতির প্রতি তীব্র আগ্রহ জন্মেছিল। 

সে পত্রিকায় সাদাকালো ছবি গুলো ছুঁয়ে দেখত 'বাহান্নতে শাড়ি পরে মেয়েদের মিছিল এ যাবার দৃশ্য'। স্কুলে থাকতে একবার বাবার সাথে ঢাকায় বেড়াতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার বাবা তাকে দেখিয়েছিলেন, 'এই হল রোকেয়া হল। এখানে মেয়েরা ৭১ এ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধ করেছিল। পত্রিকার ছবিগুলোতে যে মেয়েদের দেখা যেতো শাড়ি পরে সারিবদ্ধ হয়ে অস্ত্র হাতে ট্রেনিং নিচ্ছে তারা এই হলে থাকতো। '

এখানেই পড়তে হবে। কেননা এই বিশ্ববিদ্যালয়এর মাটি অনেক অনেক ইতিহাসের সাক্ষী, ছেলেমেয়েরা এখান থেকেই শিখিছে প্রতিবাদ করতে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তির শুরু থেকেই সে মিছিল মিটিং খুঁজে বেরিয়েছে। যদিও হলে থাকার সুযোগ মেলেনি। কোথায় সেই ছাত্র রাজনীতি! ছাত্রনেতা ! কিছুই দেখা মেলেনি।

এই যুগে কেউ এই সব দেশ নিয়ে ভাবে? হলের ছেলেরা বলতো আজকে গেস্ট রুমে মিটিং ছিল। খুব কৌতূহল নিয়ে জিগ্যেস করত মাধবীলতা বন্ধুদের কি নিয়ে আলাপ হল, ভার্সিটির সুযোগ সুবিধা দাবিদাওয়া, তোদের রাজনীতির লক্ষ কি? কি পেতে চাস তোরা এর থেকে? উত্তর আসে না কিচ্ছু না। বলেছে মিছিল যেতে না হলে হলে আর সিট দেবে না।এই সব  রাজনীতি ফিতি ভাল্লাগেনা তোদের মত বাবামার ঢাকায় বাসা থাকলে কে সাতসকাল এ এই সব মিছিল এ যায়। 

ছাত্ররাজনীতির রং বদলেছে।  সেখানে ছাত্রছাত্রীদের দাবিদাওয়া নেই আছে শুধু বড় বড় পোস্ট, অমুক ভাই তমুক নেতা।একজন বলল আরে আমাদের ক্লাসের রজন, আগের ব্যাচের প্রিতুল ভাই অনেক বড় নেতা জিয়া হলের, শুনে মনে হল একদিন আলাপ করতে হবে। আলাপ করে আরও হতাশ লাগে, এরা কি যে করে জানিনা বুঝিনা, সারারাত জেগে থেকে কি সব খায়। ঘুমায় না, সকালে হলে দেখা যায় চোখ টকটকে লাল, ঝিমচ্ছে। আমার দেখে মনে হল নেতার চোখ এতো ঢুলু ঢুলু হলে সে চোখ কিভাবে স্বপ্ন দেখাবে! মেধাবী আর দক্ষ লোক আসা দরকার রাজনীতিতে এটা খুব বুঝতে পারে।

শহীদ মিনার এর বেদিতে বসে তার চোখ ভিজে উঠত মাঝেমাঝে সেই বেদিতে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে দেখতে পেতো বাহান্ন এর দিনগুলো। সেই স্লোগান 'রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই মানতে হবে মানতে হবে'।তার বয়সী ছেলেমেয়ে গুলোই বুক পেতে দিয়েছিল ভাষার জন্য ভেবে এখনো গা শিউরে উঠে। প্রতিবাদ এর এতো সাহস, দেশপ্রেম কোথায় কিভাবে তারা পেয়েছিল সেটা এখনো সে ভেবে পায়না। স্বাধীনতার স্বপ্ন তখন শুধু এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না, প্রতিটা গ্রামের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়েছিল।
 
৭১ এ তার মা তখন গ্রামের স্কুলে পড়ত। ১৩ বছর বয়স, তাকেও এই দেশ আর স্বাধীনতার স্বপ্ন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।কোথাও জানি শুনেছে শিল পাটার সাথে কাদামাটি দিয়ে ঘটি আটকে মাথার উপরে তুললে দেশ স্বাধীন হবে।আগেপাছে না ভেবে তাই করেছে। মুক্তির চিন্তায় উন্মাতাল সবাই।পাকিস্তানী দের ভয়ে তারা এ গ্রাম সে গ্রাম লুকিয়ে থাকতো। তখন সেই ১৩ বছর বয়েসে কোন এক গণ্ডগ্রাম এর মেয়েটিও শিল পাটা মাথার উপরে তুলে নিলো ।তুলতে পেরে খুশিতে চিৎকার দিতে গিয়ে শিলপাটা পায়ে ফেলে দিল। স্বাধীনতার আকাংখা ছড়িয়ে গিয়েছিল গ্রামে-গঞ্জে দেশের কোনায় কোনায় রক্তে শিরা-উপশিরায়! সেই উন্মাতাল দেশ প্রেম এখন মনে হয় যেন ইতিহাস আর পাতায় কেবল। সেটা ভেবে খুব ঈর্ষা লাগে ইশ! কেন যে ৭১ এর আগে জন্মায়নি যুদ্ধটা দেখতে পারতো!

হিন্দি সিরিয়াল, মেকআপ, বিয়েবাড়ির বিলাসিতা কে বেশী ভালো দেখতে, ফাস্টফুড এর দামী খাবার, কে কাকে আরও বেশী দেখাবে এই প্রতিযোগিতার ভিড়ে হাঁসফাঁস লাগে তার।বোন, ভাবী, প্রতিবেশীদের চোখে সে বড্ড সেকেলে! ফ্যাশন এর খবর রাখা আত্মীয়ারা বলতো এবার ভার্সিটিতে গিয়ে মেয়ে একটু আধুনিকা হবে। ফ্যাশন মেকআপ, বিউটি পার্লার  এই সব একটু বুঝবে। কিন্তু এই সব মেকি লোক দেখানো ভাল্লাগেনা তার।  

দেখা নেই শোনা নেই ঝপাং করে বিয়ে দিয়ে দিল সমাজ।প্রথম দিনেই সে বুঝে গেল এরকম ছেলেকে যদি ক্যাম্পাসে তাকে প্রেম নিবেদন করতো  তো প্রথমেই কষে একটা চড় বসিয়ে দিত। বেয়াদবি সে একদম সহ্য করতে পারেনা। কিন্তু ধর্ম আর সমাজ এই ছেলেকে তার গলায় ঝুলিয়েছে, স্বামী নাম দিয়ে।  যেখানে প্রেম নেই সম্মান নেই, সেখানে থেকে অনেক যুদ্ধ করে বেরিয়ে এলো সে।  নীত-বোধ এর যুদ্ধ।  স্বাধীনতা যুদ্ধ সে দেখেনি কিন্তু সংসার যুদ্ধ তাকে একা সামাল দিতে হল। ঘর থেকে প্রতিবাদ শুরু হল আর সেখান থেকে বেড়িয়েই সে প্রথম মুক্ত আকাশ দেখল।  অন্যায় এর প্রতিবাদ করা শিখে নিল সে আর প্রথম রাজপথেও এলো প্রতিবাদ করতে ।

২০১৩ সাল, শাহবাগ। ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই, স্লোগানে স্লোগানে প্রথম সে নিজেকে  এই প্রথম  সে মাধবীলতার মত খুঁজে পেল। কিন্তু সমাজ তো মেয়েদের প্রতিবাদী দেখতে চাইনা, তখন সে পত্রিকা অফিসে চাকরি করে।প্রথম দিন তাকে টিভিতেও দেখা গেল আর পরদিন পত্রিকা অফিসে অফিসে যুদ্ধ, মেয়েরা যারা শাহবাগ গিয়েছে সবাই কি কি পাপ করেছে তার ফিরিস্তি শুরু হল, এই সব বলে যে 'জাহানারা ইমাম জাহান্নাম এর ইমাম' ইত্যাদি।  

অফিস এর যুদ্ধ, ঘরের যুদ্ধ দম বন্ধ হয়ে আসে আর ভাল্লাগেনা। মনে হল এ সমাজ তার জন্য না। দেশ ছাড়তে হবে আর সুযোগ মিলেও গেল। সবাই ছল ছল চোখে দেশ ছাড়লেও সে আর একবার মুক্ত আকাশে ডানা মেলার স্বাধীনতা পেল।

অনিমেষকে সে কত খুঁজেছে কিন্তু কোথাও পায়নি। অনিমেষকে তার কল্পনায় সে দেখতে পেতো প্রচন্ড মেধাবী, পরিশ্রমী, নিষ্ঠাবান, আর সৎ । মাধবীলতা শহীদ মিনারের বেদি, কলাভবন, কার্জন হল সবখানে অনিমেষ কে খুঁজে বেড়িয়েছে, কিন্তু এতোদিন পায়নি কোথাও এবার এতো বছর পরে সে অনিমেষ কে খুঁজে পেল তাও বিদেশের মাটিতে। সেই শহীদ মিনারের বেদি, কলাভবন, কার্জন হল সবখানে তার পদচারণা ছিল কিন্তু তখন কেন দেখা হল না?
 
সেই অনিমেষ প্রচণ্ড সাহসী, আত্মবিশ্বাসী, নির্ভীক যেখানে পৃথিবীর সবাই পিছিয়ে গেলেও তাকে কেউ থামাতে পারেনা। শূন্যের কাছাকাছি সম্ভাবনা থেকেও আশার আলো দেখতে পাওয়া একজন প্রচণ্ড সম্ভাবনাময় মানুষ। মেয়েমহলে এরকম ধারালো ব্যক্তিত্ব নিয়ে অনেকের মনেই হয়ত আরাধনা চলে । 

এক বন্ধু তাকে জিগ্যেস করেছিল এই তুমি যে নিজেকে মাধবীলতা ভাবো, তুমি কি পারবে সমাজ সংস্কার উপেক্ষা  করে মা হতে? যেটা মাধবীলতা হয়েছিল, শুধু ভালবাসার জন্য। 
তখন এই গল্পের মাধবীলতা বলেছিল জানিনা, হয়ত পারবেনা, বাচ্চাকাচ্চা চাই না এরকমই তাকে সবসময় বলতে শোনা যায়। যেখানে সংসারই তাকে টানেনি যেখানে ভালবাসা নেই সেই ভালোবাসা-হীন সম্পর্কে বাচ্চার স্বপ্ন দেখতেও ভালো লাগে না।

এতো বছর পরে মাধবীলতার খুব মা হতে ইচ্ছে করল। অনিমেষ এর কাছে চাইবে কারণ মেয়েরা তার সন্তান এর ভেতর একজন আদর্শ মানুষ কে দেখতে চাই।অনিমেষ কি চাইবে সব উপেক্ষা করতে সমাজ, প্রথা রীতিনীতি, আর মনের ভেতরের পুরনো দেওয়াল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসতে!

সেটা সে জানেনা যে অনিমেষ তাকে ভালবাসে কিনা, হয়ত না। কিন্তু এটা সে জানে যে অনিমেষ যাকে ভালবাসবে তার জন্য যুদ্ধ করতে কেউ তাকে বাধা দিয়ে ফেরাতে পারবেনা।

এবার আবার একটা যুদ্ধ করতে ইচ্ছে করছে খুব।  সেটা রাইফেল হাতে নিয়ে ৭১ এর মত না  হাতে হাত রেখে মুক্তির যুদ্ধ। কিন্তু একাত্তর এর যুদ্ধ না দেখলেও জীবন যুদ্ধে তাকে নামতে হয়েছে একা সে যুদ্ধও কম না! একাত্তর এ যুদ্ধ নয়মাস পরে থেমে গেছে দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। কিন্তু মাধবীলতার জীবনের যুদ্ধ শুরু হয়েছে সেই কবে থেকে। এখনো চলছে কিন্তু স্বাধীনতা মেলেনি। 

একা একা যুদ্ধ করতে করতে সে খুব ক্লান্ত। এই যুদ্ধে অনিমেষ কি তার হাতটা ধরে রাখবে! মাঝরাতে ভয় পেয়ে ঘুম ভেঙ্গে গেলে বলবে 'ভয় পেয়োনা এই তো আমি আছি'।

রাশা মহিউদ্দীন,  ১৭ই আগস্ট,২০১৭
 

 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ