১৬ অক্টোবর ২০১৮ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৭ম বর্ষ ০৪ সংখ্যা: বার্লিন, সোমবার ২২জানু–২৮জানু ২০১৮ # Weekly Ajker Bangla – 7th year 04 issue: Berlin, Monday 22Jan-28Jan 2018

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন

কন্যা অনিকা বোস প্যাফ নেতাজীর ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণ চান

প্রতিবেদকঃ মীর মোনাজ হক তারিখঃ 2018-01-25   সময়ঃ 04:45:03 পাঠক সংখ্যাঃ 429

২৩ শে জানুয়ারী ১৮৯৭, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিন। এই দিনটিকে 'দেশ প্রেম দিবস' হিসেবে এবং জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে গতবছর রাজ্যসভায় একটি বিল উত্থাপন করেছিলেন সিপিআই নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জী। বিলটি যদিওবা পাস হয়নি, তবে নেতাজীর বীরত্বপূর্ণ কাহিনী রাজ্যসভায় বিস্তারিত বর্ণনা করেছিলেন তিনি। নেতাজীকে নিয়ে বিগত ৭০ বছরে মিডিয়েতে বিভিন্য কাহিনী প্রকাশিত হলেও তাঁর রহস্যময় অন্তর্ধান নিয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

বছর কুড়ি আগে নেতাজীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বার্লিন শহরের 'হাউস অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড কালচার' একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিল, সেখানে একজন জার্মান প্রফেসর বেশ কিছু তথ্য উপাত্ত দিয়ে নেতাজীর জার্মান অবস্থানের সময়ের কাহিনী তুলে ধরেছিলেন। পুর্ব জার্মানির একটা ছোট্ট শহর 'আনাবার্গ' সেখনে এখনও ১৯৫ জন 'আজাদ হিন্দ ফৌজ' সেনাদের সমাধি রয়েছে।

কেনো নেতাজী সেসময় নাৎসি শাসক এডল্ফ হিটলারের সহায়তায় ভারতবর্ষ স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন? সেই ঘটনাকে কেন্দ্রকরেই আজ আমার এই প্রতিবেদন।

ব্রিটিশদের কবল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্য সেসময় যেসব মহান বীর নেতৃত্ব দিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন কিংবদন্তি ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। মহাত্মা গান্ধী ছিলেন অহিংসা আন্দোলনের সমর্থক এবং বিশ্বাস করতেন অহিংসা দিয়েই ব্রিটিশদেরকে ভারত থেকে সরানো যাবে, কিন্তু নেতাজী ডাক দিয়েছলেন সশস্ত্র বিপ্লবের। স্বাধীনতা নিয়ে তার বিখ্যাত উক্তি "তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব"।

১৯৩৮ সালে তিনি মহাত্মা গান্ধির তীব্র বিরোধীতার মুখে ভারতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তবে কেবলমাত্র গান্ধির মতানুসারী না হওয়াতেই কংগ্রেস কার্যনির্বাহি কমিটির সকল সদস্য পদত্যাগ করবে, এমন হুমকি দিয়ে সুভাষচন্দ্র বসুকে পদত্যাগ পত্র পেশ করতে বাধ্য করে কার্যনির্বাহি কমিটি। একপর্যায়ে কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

এরপর অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেন নেতাজী। ১৯৩৮ সালে তিনি জাতীয় পরিকল্পনা পরিষদের প্রস্তাবনা দেন। তারপর তিনি ব্রিটিশ শাসকের হাতে বন্দি হন। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ দলকে বেআইনি ঘোষণা করে।

নেতাজী কলকাতার ব্রিটিশ শাসকদের দ্বারা গৃহবন্দি থেকে অব্যাহতি পেয়ে ভারত ছেড়ে আফগানিস্তান হয়ে ইউরোপের ইটালিতে পৌছান, সেখান থেকে জার্মানিতে চলে আসেন, হিটলারের সাথে একত্র হয়ে ভারতের ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উদ্যেশ্যে। হিটলার প্রথমদিকে সুভাষ বসু কে খুব একটা সুযোগ দেয়নি, পরে যখন হিটলার বুঝতে পারে যে তার নিজের শত্রুপক্ষ ব্রিটিশরাজ সুভাষ বোসের ও শত্রু তখন নেতাজী, হিটলারের কাছথেকে সম্পুর্ন সহায়তা পায়। সুভাষ বসুর স্ত্রী, এমিলি শেঙ্কট, একজন আস্ট্রিয়ান জার্মান হওয়ায় হয়ত হিটলার তাঁর প্রতি আরো আস্থাবান হয়।

ইউরোপে এসে তিনি 'সুভাষ বসু' থেকে 'বোস' এ পরিচিত হন। তিনি যখন ১৯৪১ সালে বার্লিনে আসেন। তাঁর ব্রিটিশবিরোধী মানসিকতা যখন হিটলার বুঝতে পারে তখন জার্মান সামরিক নেতৃত্বের সহায়তায়, সুভাষ বোস দ্রুত ভারতীয় সামরিক বাহিনী গড়ে তোলেন। ভারতীয় সৈন্যরা, যারা বেশিরভাগই উত্তর আফ্রিকায় বন্দী ছিল, যারা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। তাদেরকে নিয়েই নেতাজী জার্মানিতে প্রায় ২৬০০ সৈন্য একত্র করেন, উদ্দেশ্য হল ককেশিয়ান জার্মান বাহিনীর সাথে একত্র হয়ে ইউরোপের যুদ্ধের সাথে সাথে নেতাজী সেখানে থেকেই তারা সৈন্য দেরকে পারশ্য দেশের মধ্য দিয়ে ভারতে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে সেখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটাবে। বার্লিন বসেই তিনি 'আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠন করেন এবং 'আজাদ হিন্দ রেডিও' যা একটি প্রচারমূলক রেডিও ট্রান্সমিশন ছিল, সেটি ১৯৪২ সালে জার্মানিতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে ভারতীয়দের উৎসাহীত করার জন্য শুরু হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে জার্মানি ভিত্তিক হলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুদ্ধের সময় তার সদর দপ্তরটিকে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর করা হয় এবং পরবর্তীতে রেঙুনে স্থানান্তর করা হয়। জার্মান সম্প্রচারগুলি বিভিন্ন ভাষায় ইউরোপ থেকে প্রচার করা হয়, বার্লিনে অবস্থানরত একজন সাংবাদিক এসিএন নামবিয়া রেডিও সম্প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। রেডিও সম্প্রচার ভারতীয় সকল ভাষা ছারাও জার্মান, ফ্রেন্স, ইংরেজি সহ আরবিভাষী অনুষ্টান প্রচারিত হত, ইউরোপে হেড অফিস বার্লিনে Hukumate Azad Hind in Germany নামে পরিচিত ছিল।

যেহেতু হিটলারের মিত্রপক্ষ জাপান, এশিয়া মহাদেশে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে সুভাষ বসু তখন জার্মান দের পরামর্শে ১৯৪৩ সালে একটি জার্মান ডুবোজাহাজ (সাবমেরিন) নিয়ে জাপানের পথে রওনা দেন। ইতিমধ্যে ভারতীয় অপর একজন নেতা রাসবিহারী বসু, প্রবাসে বসে একটি সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিল। এই বাহিনীর নাম ছিল ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী। ১৯৪৩ সালের ৪ থেকে ৭ জুলাই সিঙ্গাপুরস্থ মহাএশিয়া মিলনায়তনে ভারতীয় স্বাধীনতা লীগের প্রধান নেতৃবৃন্দের মহাসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতি বিপ্লবী রাসবিহারী বসু দাঁড়িয়ে সভায় একজন চমৎকার নতুন অতিথি হিসেবে সুভাষচন্দ্র বসুকে পরিচয় করিয়ে দেন। সেই সঙ্গে লীগের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুভাষ বসুকে স্থলাভিষিক্ত করার জন্য নিজের ইচ্ছের কথা ব্যক্ত করেন। এরপর সভার সব নেতৃবৃন্দ এবং সদস্য প্রাণবন্ত করতালি দিয়ে সুভাষ বসুকে স্বাগত জানান।

 

রাসবিহারী বসু প্রবাসে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সম্মানিত পরিচালক নির্বাচিত হওয়ার কারণে সুভাষ বসুকে ‘নেতাজি’ উপাধি ঘোষণা করেন। রাসবিহারী বসুর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এই মহাসভায় সুভাষচন্দ্র বসু দুই ঘণ্টাব্যাপী এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন। নেতাজীর গঠিত ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করে ইম্ফল ও কোহিমার পথে অগ্রসর হয়। ২১ মার্চ ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ মনিপুরে প্রবেশ করে। যুদ্ধের শেষ দিকে জাপান আত্মসমর্পণ করলে, সুভাষ বসু তখন এই বাহিনী প্রত্যাহার করেন। এরপর তার আর কোনো হদিস মেলেনি। কতিথ আছে রেঙুন থেকে আবার জাপান যাওয়ার পথে সুভাষ বসু কে বহনকারী বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তখন প্রায় সমাপ্তির পথে, জাপান দুর্বল হয়ে পরে, জার্মানির নাৎসিবাহিনী পরাজয়বরণ করে, তাই নেতাজীর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতা শুধু স্বপ্নই রয়ে গেলো

 

সুভাষ চন্দ্র বোস ১৯৩৩ থেকে ৩৬ পর্যন্ত বহুবার ইউরোপে এসেছিলেন তারই কোন এক সময় তার এক বন্ধু (এক ভারতীয় ডাক্তার) এর যোগসাজশে ১৯৩৬ সনে ভিয়েনার এক ডাক্তারের মেয়ে এমিলি শেঙ্কট এর সাথে পরিচয় হয়, পরিচয় থেকে ভালোবাসা, ১৯৩৭ সালে অস্ট্রিয়ায় এমিলির সাথে সুভাষ এর বিবাহ হয়। কিন্তু বিয়ের পরে সুভাষ একাই ভারতে ফিরে যায়, কারন সেসময় সুভাষ বসু ভারতের কংগ্রেস পার্টির সভাপতি, এমিলি একাই ভিয়েনায় বেশ কষ্টে দিন কাটায়, কারন ইউরোপে তখন যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে অথচ সুভাষ তখন সম্পুর্নভাবে ভারতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। ১৯৪১ সনে সুভাষ বসু যখন আবার জার্মানিতে আসে ও ভারতের বিপ্লবের প্রস্তুতি নেয় তখন আবার তারা দুজন বার্লিনে একত্রে বেশ বড় একটা বাড়ীতে বসবাস করে, ১৯৪২ সে তাদের কন্যা অনিতা বোস প্যাফ এর জন্ম। এমিলি বোস ১৯৯৬ সনে বার্লিনে মারাগেছে

সম্প্রতি প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া'র খবরে জানাজায় যে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর একমাত্র কন্যা অনিতা বোস প্যাফ ভারত সরকারের কাছে তাঁর বাবার চিতাভস্ম এর ডিএনএ এনালাইসিস পরীক্ষা চান, যা জাপানের রেইনকোজি মন্দিরে রাখা আছে। উল্লেখযোগ্য যে নেতাজী ১৮ আগস্ট ১৯৪৫ প্লেন যোগে বার্মা থেকে জাপান যাওয়ার পথে তাইপের কাছে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন। মিসেস অনিতা বোস প্যাফ একজন জার্মান অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন এবং আউসবুর্গ ইউনিভার্সিটি তে বহুদিন শিক্ষকতা করেন।

 

 

-------------------------------------
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন ইন্টারনেট ব্লগ ও জার্মান কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী

 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ