২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং

সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় সাজা ১০ ভাগেরও কম

সড়ক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা আমাদের রয়েছে, যার কারণে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে

প্রতিবেদকঃ DW তারিখঃ 2018-05-28   সময়ঃ 18:36:49 পাঠক সংখ্যাঃ 104

বাংলাদেশে বহুল আলোচিত বিষয় সড়ক দুর্ঘটনা৷ অথচ চালকরা ভ্রুক্ষেপ করছেন না, এখনও তারা বেপরোয়া, কেন তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না? আইনে কি কোনো ফাঁক আছে? এ সব নিয়েই ডয়চে ভেলের মুখোমুখি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ৷ 

ডয়চে ভেলে: বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার কেমন?

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ: বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার বেশ কয়েক বছর ধরে অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে৷ অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি৷ সড়ক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা আমাদের রয়েছে, যার কারণে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে৷

সড়ক দুর্ঘটনায় মামলার হার কেমন?

সড়ক দুর্ঘটনায় মামলার সংখ্যা অত্যন্ত কম৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে যাঁরা দুর্ঘটনার শিকার হন, তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হন না৷ খুবই কম সংখ্যক মামলা থানায় লিপিবদ্ধ হয়৷ আর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি যা হয়,আমার মনে হয় তা ১০ ভাগেরও কম৷ এর কারণ হলো দীর্ঘ সময় ধরে আদালতে সাক্ষী দেয়া বা দুর্ঘটনা প্রমাণ করা কঠিন বলে৷ আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেকেই এই প্রক্রিয়ায় যান না৷ তাছাড়া সাধারণ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যাঁরা গাড়ির চালক থাকেন বা মালিক থাকেন, তাঁরা মিটমাট করে নেন কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়ে৷ এ কারণে মামলাগুলো চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত আসে না৷

 

সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত আমাদের যে আইন, সেটা কত সালের? এটা কি পর্যাপ্ত? (CLICK IMAGE FOR AUDIO)

মোটর ভেহিকেল অর্ডিন্যান্স আমাদের দেশে যেটা আছে, সেটা আশির দশকের আইন৷ এখানে সাজা ছিল তিন বছরের৷ আমরা রিট করেছিলাম৷ সেখানে আদালত সাজা বাড়িয়ে সাত বছর করে৷ তারপরও আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে যে, এই সাজাটাও কম৷ আইন সংশোধন করতে বলেছে আদালত৷ সেই আইনে যে বিধান আছে, সেটা কার্যকর করা গেলেও সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব৷ কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই আইনের প্রয়োগ হয় না৷ মালিক, ড্রাইভার, পথচারী – কেউ সেটা মানতেও চান না৷ এ কারণে দুর্ঘটনা দিন দিন বাড়ছে

এই আইনটার দুর্বলতা কোথায়?

মূল দুর্বলতা হলো সাজার পরিমাণ কম৷ আর প্রাথমিক স্তরে এখানে যে জরিমানা, সেটা এতই কম যে যাঁরা জরিমানা দেন তাঁদের কাছে এটা সহনীয়৷ এ কারণে এটা খুব একটা কার্যকর হয় না৷ যেমন ধরুন রং ড্রাইভিং, রং পার্কিং বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া চালানো – এগুলো করলে বিদেশে অনেক টাকা জরিমানা হয়৷ ফলে সেখানকার মানুষ এ ধরনের অপরাধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন৷ আমাদের দেশে এটা খুবই কম৷ ৫০০ টাকা বা এক হাজার টাকা জরিমানা করা হলে মালিক সেটা দিয়ে চলে যান৷ এবং পরবর্তীতে আবারো একই কাজ করতে দ্বিধা করেন না৷

বিদেশের সঙ্গে আমাদের আইনের পার্থক্য কী?

এই যে আমাদের সাজা কম৷ ক্যানাডায় ১০ বছরের সাজা৷ এমনকি অনেক দেশেই যাবজ্জীবন সাজা আছে৷ এছাড়া বিদেশে আরেকটা জিনিস আছে, যেটা আমাদের দেশে নেই৷ বহু দেশে সাজা বা জরিমানার সঙ্গে অপরাধের মাত্রা ধরে ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে পয়েন্ট কাটা হয়৷ যেমন কোনো অপরাধের জন্য এক পয়েন্ট বা দুই পয়েন্ট৷ এভাবে নির্দিষ্ট একটা পয়েন্ট কাটার পর ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করা হয়৷ তার মানে সেই ব্যক্তি আর কোনোদিনই লাইসেন্স পাবেন না৷ এ কারণে তাঁরা সতর্ক থাকেন৷ এটা আমাদের এখানে করা যায় কিনা সে ব্যাপারে আমি বিআরটিএ-র একজন পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি৷ তাঁরাও এটা নিয়ে ভাবছেন৷ আমাদের দেশে একটা দুর্ঘটনার পর জরিমানা দিলেন, মামলা হলো, কিন্তু লাইসেন্সের ওপর এর প্রভাব পড়লো না৷ ফলে কেউ-ই এটাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না৷

 

আমরা কেন আইনে এটা আনতে পারছি না?

আমাদের এখানে যাঁরা সরকারি দায়িত্বে আছেন, এটা তাঁদের মাথা থেকে বের হতে হবে৷ তা না হলে আমরা যখন বলব, তখন কতটা তাঁরা নেবেন তা বলা মুশকিল৷ বিআরটিএ-র পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি৷ তাঁরা বলেছেন যে তাঁরা এটা করবেন৷ আশা করি ভবিষ্যতে তাঁরা সত্যিই লাইসেন্স থেকে পয়েন্ট কাটার ব্যবস্থা করবেন৷ এটা করলে একজন ড্রাইভার যখন দেখবেন যে একটা, দু'টো বা চারটা অ্যাক্সিডেন্ট করলে আমার লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে, তখন অবশ্যই তাঁরা সতর্ক হবেন৷

আইন শক্ত করে কি সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব?

আইন হলো একজনের মনে ভয়ভীতির সৃষ্টি করা, যাতে সে দ্বিতীয়বার এ কাজ না করে৷ এখানে শুধু আইনের প্রয়োগই না, আমরা যারা পথচারী তাদেরও অগ্রসর হতে হবে৷ কয়েকদিন আগে দেখলাম, চলন্ত বাসে একজন মাথা বাইরে বের করে রেখেছেন, হাত বের করে রেখেছেন৷ তাঁদের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে৷ জেব্রা ক্রসিং ছাড়াই আমরা হুট করে রাস্তা পার হচ্ছি৷ এতেও দুর্ঘটনা ঘটে৷ এ ধরনের দুর্ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের অসতর্কতা বা নিবুর্দ্ধিতাও অনেক সময় দায়ী৷ এ সব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে অনেক কাজ করতে হবে৷ এখানে গাড়ি, মালিক, চালক, পথচারী সবাইকে সচেতন হতে হবে৷ পাশাপাশি আইন প্রয়োগ করে সড়ক দুর্ঘটনা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব৷

আমাদের দেশে যত ড্রাইভার আছেন, তাঁদের সবার তো লাইসেন্সই নেই৷ তাই না?

এটা তো মৃত্যুর লাইসেন্স দেয়া৷ একজনের যদি লাইসেন্স না থাকে আর সে যদি গাড়ি চালায়, তাহলে সেই গাড়িতে দুর্ঘটনা হওয়াটাই তো স্বাভাবিক৷ পরীক্ষা না দিয়েই ৭-৮ হাজার মানুষকে সরকার লাইসেন্স দিতে চেয়েছিল৷ আমরা মামলা

সড়ক দুর্ঘটনার কী পরিমাণ মামলায় সাজা হচ্ছে?

সাজার পরিমাণ ১০ ভাগেরও কম৷ ইদানীং দু-চারটা মামলায় সাজা হয়েছে৷ মিশুক মনিরদের মামলায় হাইকোর্টে বিচার হওয়ায় সাজা হয়েছে৷ এর আগে একজন ট্রাক ড্রাইভার ইচ্ছাকৃতভাবে একজনকে হত্যা করেন৷ সেই মামলায় সাজা হয়েছে৷ এটা নিয়ে মালিক ও ড্রাইভাররা হরতাল ডেকেছিল, আদালতের বিরুদ্ধে৷ তখন আমরা একটা মামলা করেছিলাম৷ এরপর তারা হরতাল প্রত্যাহার করে নেয়৷ তবে সাজা বৃদ্ধি করাটা খুবই জরুরি৷

করে সেই লাইসেন্স দেয়া আটকিয়েছি৷ আপনি যদি নিয়ম-কানুন না জানেন, তাহলে গাড়ি চালালে আপনার হাতে শত শত মানুষের মৃত্যু হওয়াটাই তো স্বাভাবিক৷

আরেকটা আলোচিত মামলা ছিল, সংবাদের সাবেক বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর মৃত্যুর ঘটনা...

হ্যাঁ, এটা তো আপিল বিভাগের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে৷ এখন তারা যদি টাকা না দেয় তাহলে আদালতের মাধ্যমে অবমাননার মামলা করে টাকাটা উদ্ধার করতে হবে৷ কিন্তু এটা করতেই তো ২৭ বছর লেগে গেছে৷ আমাদের অনেকেই এ ধরনের বিষয়গুলোতে নিয়মগুলো জানেন না৷ একটা তো ফৌজদারি মামলা হবে৷ তার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ চেয়েও আপনি একটা মামলা করতে পারেন৷ তবে সেটা ছ'মাসের মধ্যে জেলা জজের কাছে করতে হয়৷ না জানার কারণে অনেকেই সাধারণত এই ধরনের আবেদন করেন না৷ এখানে কোনো দুর্ঘটনার পর ড্রাইভার গ্রেপ্তার হলেও তিনি জামিন পেয়ে যান৷ এটা অজামিনযোগ্য করা হলে হয়ত বিষয়টা কঠিন হতো৷ সরকারের কাছে সাজেশন থাকবে, তারা যেন একটা মহাপরিকল্পনা করে, জরুরি বিষয় বিবেচনা করে মামলাটা যেন রিশাফল করে৷ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সরকার এমন একটা কিছু যেন করে, যাতে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যায়৷

তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের এক গ্রামে ছবির শুটিং স্পট দেখে ঢাকা ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন খ্যাতিমান চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ এবং শহিদ বুদ্ধিজীবী, নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর ছেলে এটিএন নিউজের প্রধান নিবার্হী মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন৷ এ দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ ও শিল্পী ঢালী আল-মামুনসহ চারজন আহতও হয়েছিলেন৷

 

 

 



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ