২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং
সাপ্তাহিক আজকের বাংলা - ৭ম বর্ষ ৩২ সংখ্যা: বার্লিন, সোমবার ০৬অগা–১২অগা ২০১৮ # Weekly Ajker Bangla – 7th year 32 issue: Berlin, Monday 06Aug-12Aug2018

যে বার্তা দিয়ে গেল ‘কিশোর বিদ্রোহ’

জনগণ কিশোরদের কাজকে বাহ্বা দিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছিল

প্রতিবেদকঃ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তারিখঃ 2018-08-12   সময়ঃ 17:30:13 পাঠক সংখ্যাঃ 58

সম্প্রতি এক অভূতপূর্ব ‘কিশোর বিদ্রোহ’ দেশকে প্রচ-ভাবে নাড়া দিয়ে গেল। ঘটনা শুরু হয়েছিল ঢাকায়, ২৯ জুলাই। সেদিন ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে দুটি বাস, একটি অপরটির আগে যাওয়ার জন্য পাল্লাপাল্লি করতে গিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো দুজন ছাত্রছাত্রীকে চাকার নিচে পিষে হত্যা করেছিল। সারাদেশে এ ধরনের হত্যার ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে এবং সেসবের সংখ্যা কিছুদিন ধরে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেসবের কোনো সুষ্ঠু বিচার হয়নি, হচ্ছে না। রাজপথ আজ বস্তুত মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। ২৯ জুলাইয়ের ঘটনায় ছাত্রছাত্রী ও দেশবাসীর মনের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ‘কিশোর বিদ্রোহে’ রূপ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। সড়কপথের অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য আর চলতে দেওয়া যায় না এবং তার অবসান ঘটাতে হবেÑ এই সুস্পষ্ট প্রত্যয় নিয়ে স্কুল-কলেজের কিশোরদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব জাগরণ। দলে দলে নেমে এসে তারা রাজপথকে তাদের এক ধরনের দখলে নিয়ে নিয়েছিল।

কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের রাজপথ-অভিযান গতানুগতিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধের পদক্ষেপকে ছাড়িয়ে, ‘পরিবর্তন যে সম্ভব’ তা হাতেনাতে প্রমাণ করার বলিষ্ঠ কর্মকা-ে রূপ নিয়েছিল। ‘পরিবর্তন প্রয়োজন, পরিবর্তন সম্ভব’Ñ এ কথা প্রমাণ করার এক ঐতিহাসিক ‘মিশন’ নিয়ে আন্দোলনকারীরা তাদের অভিযানের কর্মপন্থাকে এগিয়ে নিয়েছিল। ক্রমেই তাদের মধ্যে এ ভাবনাও জেগে উঠতে শুরু করেছিল যে, শুধু ‘সড়ক ব্যবস্থাপনাই’ নয়, আজ গোটা ‘রাষ্ট্রেরই’ মেরামত কাজ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সে কাজটিও ভবিষ্যতে হয়তো তাদেরই করতে হবে। তবে তারা তাদের আন্দোলনকে আপাতত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’Ñ এই সীমিত লক্ষ্যে পরিচালনা করার পদক্ষেপ নিয়েছিল।

কিন্তু এ ‘সামান্য’ কাজটিও ছিল এক কঠিন সংগ্রামের বিষয়। কারণ এর সঙ্গে শক্তিশালী মাফিয়াচক্রের স্বার্থ জড়িত। তার সঙ্গে আবার সরাসরি যুক্ত রয়েছে সরকার ও রাষ্ট্রশক্তি। পরিবহন সেক্টরকে ঘিরে চলছে কোটি-কোটি টাকার বেআইনি ‘চাঁদাবাজি’র কারবার। এই চোরাই অর্থের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী মাফিয়াচক্রের ক্রিমিনাল সিন্ডিকেট। আইন না মেনে চলার অপরাধ থেকে ‘দায়মুক্তি’র বিনিময়ে ‘চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি’র এই বিপুল অর্থ আদায় করা হয়ে থাকে। ফিটনেস নেই, লাইসেন্স নেইÑ তথাপি গাড়ি নির্বিঘেœ চলছে কেবল পুলিশ, বিআরটিএ, শ্রমিক-মালিক ইউনিয়ন প্রভৃতির কাছ থেকে ‘দায়মুক্তির ছাড়পত্র’ কিনে নেওয়ার মাধ্যমে। বেআইনি অপরাধমূলক কাজ বহাল না থাকলে স্বভাবতই এরূপ ‘দায়মুক্তি’ কেনাবেচার কারবার আর থাকবে না। তাই পরিবহনের ‘ক্রিমিনাল সিন্ডিকেট’ই নিজেদের স্বার্থে এই ‘আইন না মেনে চলার’ ব্যবস্থা বহাল রেখেছে।

এসব কোমলমতি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রথম দিনই বর্বর পুলিশি হামলা নেমে এসেছিল। এতে সবার মঝে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। ক্ষোভের সে আগুনে ঘৃতাহুতি হিসেবে যুক্ত হয়েছিল নৌপরিবহনমন্ত্রী ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের ডাকসাইটে নেতার দাঁত বের করে হাসতে হাসতে দুজন ছাত্রছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর এই ট্যাজেডিকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ হালকা কথায় উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি। মিডিয়া ও ফেসবুকে সে দৃশ্য দেখে চতুর্দিক থেকে তীব্র ধিক্কার উঠেছিল। সবাই ক্রোধে ফেটে পড়েছিল। ‘কিশোর বিদ্রোহ’ বিদ্যুৎগতিতে ঢাকার প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও দেশের সর্বত্র দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে তা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময়কালকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ছাত্রছাত্রীরা ইউনিফর্ম পরিধান করে ও স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে ট্র্যাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল। নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে তারা সে দায়িত্ব পালন করেছিল। দেশবাসীকে চমকে দিয়ে, ‘নিয়ম মেনে রিকশা-গাড়ি চালানো’ যে সম্ভব, তার বাস্তব নিদর্শন তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। জনগণ অভিভূত হয়েছিল। তারা কিশোরদের কাজকে বাহ্বা দিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছিল।

কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা রাজপথে অবস্থান নিয়ে যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট, রেজিস্ট্রেশনের কাগজপত্র, চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখে কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে মামলা করার জন্য যানবাহনটি পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার নিয়মতান্ত্রিক পথ অনুসরণ করেছিল। তারা কোনো ভাঙচুর করেনি। সবার সঙ্গে ভদ্র আচরণ করেছে। কিন্তু আইনানুবর্তিতার ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয়নি। রাস্তায় লাইন ধরে রিকশা ও গাড়ির চলাচল নিশ্চিত করার জন্য তারা হাতে হাত ধরে চেইন তৈরি করত। এমনকি বড় সড়কগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য ইমার্জেন্সি গাড়ি চলাচলের জন্য একটি পৃথক লেইন খালি রাখারও ব্যবস্থা করেছিল। আইন কার্যকর করার জন্য তাদের এই তদারকি থেকে মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ কর্মকর্তা, সচিব, বিচারপতি, সেনা সংস্থা ইত্যাদি কারো যানবাহনকেই তারা রেহাই দেয়নি। রাষ্ট্র ও সমাজের একেবারে ওপরতলায়ও, জনগণের অগোচরে, কী মাত্রায় আইন অমান্য করা হয়ে থাকে এবং কী মাত্রায় স্বেচ্ছাচার চলে, কিশোরদের এই অভিযানের ফলে তা উন্মোচিত হয়েছিল। এসব জানতে পেরে জনগণ স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। ‘রাষ্ট্রেরও যে মেরামত প্রয়োজন’Ñ সে উপলব্ধিও তাদের মধ্যে গভীর হচ্ছিল।

এই অভূতপূর্ব আন্দোলনের অগ্রগতি দ্রুত থামিয়ে দেওয়ার জন্য সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এর কারণ হলো এই যে, এই আন্দোলন ক্রমাগতভাবে ও অতি ত্বরিতগতিতে যেভাবে বিস্তৃত হচ্ছিল, তাতে তা শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেয়, সে বিষয় নিয়ে সরকার আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনে যেনতেন উপায়ে ‘বিজয়ী’ হওয়ার ছক কার্যকর করার ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যাপক আন্দোলন বিঘœ হয়ে ওঠে কিনাÑ সে বিষয়ে সরকার দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তা ছাড়া সরকারের ‘রেজিমেন্টেড’ লুটেরা-সন্ত্রাসী-মাফিয়ানির্ভর শক্তিভিতের জন্য এই আন্দোলন হুমকি হয়ে উঠেছিল। আন্দোলনের মুখে সেই শক্তিভিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি যদি অপসারিত হয় তা হলে ক্ষমতার সামগ্রিক ভিত্তির অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে ভেবে সে ভীত হয়ে পড়েছিল। যে লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থের সে রক্ষক তাকে রক্ষার প্রয়োজনেই এই আন্দোলনকে যে কোনো উপায়ে বন্ধ করা সরকারের প্রধান ও অতি জরুরি লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল।

সরকার নরম-গরম পথে আন্দোলনকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা নিয়েছিল। আন্দোলনের প্রশংসা করে মুখে নানা কথা বলার পাশাপাশি একই সঙ্গে তাকে ‘ডা-া মেরে ঠা-া করার’ নীতি গ্রহণ করেছিল।

আন্দোলনটির প্রতি সরকারের সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশ করে কথাবার্তা বলাটি ছিল তার একটি কৌশলমাত্র। এ বিষয়ে সরকার যদি আন্তরিকই হতো তা হলে সে প্রথমদিনই মন্ত্রিসভা থেকে ধিকৃত নৌমন্ত্রীকে অপসারণ করতে পারত। নির্ভেজাল দেশপ্রেমে জাগরিত ছাত্রছাত্রীদের রাজপথ ছেড়ে কাসে ফিরে যাওয়ার জন্য চাপ না দিয়ে তাদের ‘কাসেও থাকো আবার রাজপথেও থাকো’Ñ এমন একটি পথ বাতলে দিতে পারত। যেমন কিনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিদিন রোটেশনে ১০০ শিক্ষার্থীকে ট্র্যাফিক পুলিশের কাজে সহায়তা করার জন্য স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন ও অন্য সবার যথাবিহিত কাস করার মতো ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি নির্দেশনা জারি করতে পারত। ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের জন্য সব স্কুল-কলেজে প্রতিদিন বিকালে প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু করার ঘোষণা দিতে পারত। ছাত্রদের জন্য হাফটিকিট ব্যবস্থা আরও সর্বজনীন, সর্বব্যাপী ও নিখুঁত করার নির্দেশনা দিতে পারত। বাস-সার্ভিসে ড্রাইভার-কন্ডাক্টরদের থেকে ‘কন্ট্র্যাক্টে ভাড়া আদায়ের’ নিয়ম অবৈধ বলে তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা করতে পারত। এসব কোনোকিছুই সে করেনি। এসব পদক্ষেপের কথা ভাবার বদলে সরকার একদিকে ‘প্রবোধমূলক প্রতিশ্রুতি’ ও অন্যদিকে পুলিশ ও গু-াবাহিনীর সন্ত্রাস দ্বারা আন্দোলনকে ‘মোকাবিলা’ করার পথ অবলম্বন করে ছলে-বলে-কৌশলে ছাত্রছাত্রীদের কাসে ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের নির্জীব-নিরুপদ্রব করে রাখার পথ গ্রহণ করেছিল।

সরকার নিষ্ঠুর বর্বরতা প্রয়োগ করে হামলা চালিয়েছিল। পুলিশ, র‌্যাব প্রভৃতির পাশাপাশি আইয়ুব আমলের এনএসএফের কায়দায়, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী গু-াবাহিনীকেও সরকার মাঠে নামিয়েছিল। পুলিশ ও গু-াবাহিনীর হামলা-অত্যাচারের ফলে আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ অগ্রগতিকে অসম্ভব করে তোলা হয়েছিল। সংঘর্ষ-সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল। কিশোরদের ওপর পুলিশ ও গু-াবাহিনীর বর্বর আক্রমণের প্রতিবাদে দেশবাসী ফুঁসে উঠেছিল। দমননীতি চালিয়ে আন্দোলনকে বন্ধ করে দেওয়ার অজুহাত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সরকার ‘আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াতের’ অনুপ্রবেশের কথা প্রচার করতে শুরু করেছিল। রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একটি আন্দোলনকে দলীয় চরিত্র আরোপ করে সরকার সেটিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করার কৌশল নিয়েছিল। কারণ আন্দোলনের ওপর সরকারের প্রভাব না থাকলেও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে সরকার ছিল অনুকূল অবস্থানে। অন্যদিকে ক্ষমতার রাজনীতির প্রয়োজনে বিএনপিও একই পথ গ্রহণ করেছিল। ফলে ‘কিশোর বিদ্রোহের’ স্বাভাবিক অগ্রগতি ও সম্ভাবনা লুটেরা-বুর্জোয়ার স্বার্থরক্ষাকারী দুই বুর্জোয়া দলের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মরণ খেলার হাতে বলি হওয়ার বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল।

আন্দোলন শুরু হওয়ার ৬-৭ দিন পর এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যুক্ত হয়েছিল। এর ফলে আন্দোলনের এক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছিল। এ পর্যায়ে সংঘাত আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাশাপাশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রীরাও বিপুলসংখ্যায় আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। ছাত্রদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের গু-াবাহিনী নজিরবিহীন বর্বরতা নিয়ে হামলে পড়েছিল। এই অবস্থায় ‘নিরাপদ সড়কের’ ইস্যুটিকে পেছনে ফেলে স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে এসেছিল ছাত্রলীগ ও পুলিশের নির্যাতনের বিচারের দাবি ও ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই’ সেøাগানটি। পুলিশ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। কিন্তু সরকার তার হিংস্র ও বর্বর দমন-পীড়ন থেকে বিরত হওয়ার বদলে তা আরও জোরদার করেছিল।

‘কিশোর বিদ্রোহে’ অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীদের অভিযান ছিল অভাবনীয়ভাবে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ। তাদের অভিযানের কারণে যান চলাচল কোনোভাবে বিঘিœত হয়নি। কিন্তু পরিবহন মালিকদের মাফিয়া সিন্ডিকেট অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট সংগঠিত করে জনজীবনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করেছিল। ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাটের সুযোগগুলো রক্ষার জন্য দেশবাসীকে জিম্মি করে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য সে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। এটি ছিল একটি বেআইনি পদক্ষেপ। সরকার এই বেআইনি ধর্মঘটের সংগঠকদের গ্রেপ্তার বা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কিন্তু আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস ও ছাত্রলীগের গু-াদের পিস্তল-বোমা-চাপাতি-রড দিয়ে হামলা করতে দ্বিধা করেনি। সরকার আজও সে হামলা অব্যাহত রেখেছে। গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা, রিমান্ড ইত্যাদি চলছে। ছাত্রলীগের গু-াবাহিনীর আক্রমণ, টর্চার, হুমকি চলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র, শিক্ষক, প্রশাসন প্রভৃতিকে টেরোরাইজ করা চলছে। হাজার-হাজার পুলিশ দিয়ে বিভিন্ন এলাকা রেইড করা হচ্ছে। এসবের মধ্য দিয়ে আবার প্রমাণিত হয়েছে সরকার লুটেরা-মাফিয়া-ক্রিমিনালদের পক্ষে এবং জনগণের বিরুদ্ধে।

আন্দোলনের দিনগুলো ছিল অসংখ্য ঘটনায় ভরপুর। প্রতিদিন চতুর্দিকে চলতে থাকা হিংস্র আক্রমণ-হামলা-সংঘাত-সংঘর্ষ-নৈরাজ্য-সন্ত্রাসের পরিস্থিতি আন্দোলনকারীরা সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে যথার্থভাবেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছিল। আন্দোলনের খবরাখবর ও তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। সত্য খবরের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়েছিল নানা ভুয়া খবর ও গুজব। সরকারি দলসহ নানা মহল এসবের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছিল। ‘গুজব নিয়েও গুজব সৃষ্টির’ খেলা শুরু হয়েছিল। কোনটা সত্য, কোনটা গুজব তা বুঝে ওঠা হয়ে উঠেছিল কঠিন। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ায় গুজবের ছড়াছড়ি আরও বেড়েছিল। যোগাযোগহীনতা ও বিশৃঙ্খলার এক নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা চলেছিল।

সব আন্দোলনই তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ই রাজনৈতিক চেতনা ও বৈশিষ্ট্যে কমবেশি অভিষিক্ত হয়। এই আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এই স্বাভাবিক বিকাশ ঘটতে দেখা গেছে। ‘ট্র্যাফিক ব্যবস্থা মেরামতের’ আওয়াজ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ‘রাষ্ট্র মেরামতের’ ভবিষ্যৎ কর্তব্যের প্রত্যয়ে উত্তোরিত হয়েছিল। আন্দোলনের ক্ষেত্রে এটি ছিল ইতিবাচক। আন্দোলনের বিকাশের জন্য এর ধরনের ‘রাজনীতিকরণ’ সহায়ক। কিন্তু যেটি ক্ষতিকর তা হলো তার ‘দলীয়করণ’। এ দুটি বিষয় মোটেও এক নয়। এবারের ‘কিশোর বিদ্রোহের’ স্বাভাবিক বিকাশকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে তার দলীয়করণের তথা তাকে কৃত্রিমভাবে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অনুষঙ্গ করার প্রয়াসের মধ্য দিয়ে।

দুটি বাসের বেপরোয়া পাল্লাপাল্লি ঘটনার মতো লুটেরা দ্বিদলীয় রাজনীতির রেষারেষি আজ আমাদের পিষে মারছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতির ‘সার্বিক মেরামত’ আজ জরুরি কর্তব্য হয়ে উঠেছে। প্রয়োজন হয়ে পড়েছে একটি মৌলিক সমাজ-বিপ্লবের। ‘শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র-জনতার’ সমবেত শক্তির জাগরণের মধ্য দিয়েই সে কাজটি করতে হবে। তার পথ রচনাই এখন বড় কর্তব্য। ছাত্রছাত্রীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের আশু সমাপ্তি কীভাবে ঘটবে তা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও এ কথা নিশ্চিত বলা যায় যে, শেষ পর্যন্ত ‘কিশোর বিদ্রোহের’ এই অভূতপূর্ব জাগরণের বিজয় হবেই। তা সে আজ হোক কিংবা হোক তা কাল অথবা পরশু।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি,  সূত্র: আমাদের সময়



আজকের কার্টুন

লাইফস্টাইল

আজকের বাংলার মিডিয়া পার্টনার

অনলাইন জরিপ

প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার রোহিঙ্গা দেরকে অত্যাচার করে ফলে ২০১৭ তে অগাস্ট ২৫ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ মাসে ৫ লক্ষ্য রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশ শরণার্থী দেরকে আবার ফিরে পাঠিয়ে দিক?

 হ্যাঁ      না      মতামত নেই    

সংবাদ আর্কাইভ